মূল কনটেন্টে যান
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
ঢাকা
--:--
সিডনি
--:--
ব্রেকিং
শাপলা চত্বর ঘটনা: শেখ হাসিনা ও বেনজীরসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চার্জ গঠনআইসিসির পরোয়ানা তোয়াক্কা না করে ওয়াশিংটনে নেতানিয়াহু; ট্রাম্পের সাথে রেকর্ড বৈঠকবাংলাদেশসহ ৬০ দেশের উপর ট্রাম্পের নতুন শুল্ক, তালিকায় আছে কোন কোন দেশ  পদত্যাগের প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি: ‘প্রশ্নটা বিব্রতকরপাঠ্যবইয়ে থাকছে না ওসমান হাদির বীরত্বগাথাএবিএম আবদুল্লাহর ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগ বাতিলশাপলা চত্বর ঘটনা: শেখ হাসিনা ও বেনজীরসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চার্জ গঠনআইসিসির পরোয়ানা তোয়াক্কা না করে ওয়াশিংটনে নেতানিয়াহু; ট্রাম্পের সাথে রেকর্ড বৈঠকবাংলাদেশসহ ৬০ দেশের উপর ট্রাম্পের নতুন শুল্ক, তালিকায় আছে কোন কোন দেশ  পদত্যাগের প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি: ‘প্রশ্নটা বিব্রতকরপাঠ্যবইয়ে থাকছে না ওসমান হাদির বীরত্বগাথাএবিএম আবদুল্লাহর ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগ বাতিল
অর্থনীতি

গোপন বাণিজ্য চুক্তি ও ভূ-রাজনীতির নতুন মেরুকরণ

বিশেষ প্রতিবেদক ১ মাস আগে মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬ ১২৪ বার পঠিত

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিগত দিনগুলোর কিছু বিস্ফোরক বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। দেশ ছাড়ার আগে এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন বার্তায় শেখ হাসিনা দাবি করেছিলেন যে, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ কিংবা বঙ্গোপসাগরে মার্কিন একাধিপত্য মেনে না নেওয়া এবং তাদের কৌশলগত কিছু শর্তে রাজি না হওয়ার কারণেই তাকে ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়েছে। আমেরিকার শর্ত মেনে নিলে বা বাণিজ্য ও কৌশলগত চুক্তিগুলোতে সই করলে হয়তো আমাকে ক্ষমতা ছাড়তে হতো না।

ঢাকা: আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বতীকালীন সরকারের পররাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে, সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পন্ন হওয়া একটি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিকে কেন্দ্র করে অন্তর্বতীকালীন সরকারের স্বচ্ছতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দল ও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, এই চুক্তিটি জনসমক্ষ থেকে আড়াল করে সম্পূর্ণ ‘গোপনে’ সম্পন্ন করা হয়েছে।

উপদেষ্টাদের বক্তব্য ও সরকারের অবস্থান : চুক্তিটি নিয়ে বিতর্ক শুরু হওয়ার পর সরকারের বিভিন্ন নীতি-নির্ধারক ও উপদেষ্টাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে আত্মপক্ষ সমর্থন এবং ব্যাখ্যামূলক বক্তব্য আসতে দেখা গেছে। সাবেক অন্তর্বতীকালীন সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছেন, ভোটের মাত্র তিন দিন আগে অন্তর্বতী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তি করেছে, তার সাথে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বা পররাষ্ট্র উপদেষ্টার কোন সম্পৃক্ততা ছিল না। তৌহিদ হোসেন এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এতে সামান্যতমও যুক্ত ছিল না। এটাতে যুক্ত ছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। কোনো কারণ হয়তো ছিল পেছনে, যে জন্য আমরা বাধ্য ছিলাম। কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকলে সই করার বিষয়টা নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়াই যথাযথ হত। সাত সদস্যের ‘কিচেন কেবিনেট’ অন্তর্বতীকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতো বলে দাবিও করেছেন সাবেক এই উপদেষ্টা। তিনি জানান, তারা প্রতি মঙ্গলবার বৈঠক করতেন। আর তার নিজের মন্ত্রণালয়েই একাধিক উপদেষ্টার প্রভাব ছিল এবং তিনবার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তবে তা গৃহীত হয়নি।

বিষয়টি পরিস্কার করতে গিয়ে তৌহিদ হোসেন বলেছেন, এক্ষেত্রে তাদের যথেষ্ট অভিজ্ঞতা নেই। তারপরেও তাদের মতামতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে হতো। কারণ, উচ্চপর্যায়ে তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ‘ডিপ স্টেট’ সক্রিয় ছিল কি না, সেই প্রশ্নেরও জবাব দেন তৌহিদ হোসেন। বললেন, ডিপ স্টেট পৃথিবীতে সব ঘটনার সাথেই জড়িত থাকে। ডিপ স্টেট যুক্ত হয়, তবে স্রোতের বিপক্ষে নয়। তিনি বলেন, আমি মনে করি আওয়ামী লীগ রাজনীতি থেকে একেবারে আউট হয়ে গেছে বা যাচ্ছে এ রকম থাকবে না। আমাদের মানুষজনের স্মৃতিশক্তি খুব দীর্ঘ না। আমি মনে করি, বিশ্বাস করি যে তারা রাজনীতিতে ফিরে আসবে এবং আমার অনুমান আগামী নির্বাচনে তারা অংশ নেবে।

চুক্তি নিয়ে আসিফ নজরুল বলেছেন চুক্তির বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তাকে এসব বিষয়ে অন্ধকারে রেখে সবকিছু করা হয়েছে। সাবেক আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়ে আইন বা প্রথা কি বলে? নিয়মানুযায়ী কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদনের আগে আইন মন্ত্রনাালয়ের ভেটিং এর দরকার হয়। চুক্তির খসড়া না দেখে বা আইনমন্ত্রী কিছু না জানলে মন্ত্রনালয়ের ভেটিং ছাড়াই কি চুক্তিটি সম্পন্ন হয়ে গেল?

চুক্তির বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া অভিযোগ করেছেন যে, এই চুক্তির ব্যাপারে তাদের দল বা অন্য অংশীজনদের মতামত নেওয়া হয়নি। তিনি আরও দাবি করেন, চুক্তিটি নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে তড়িঘড়ি করে সম্পন্ন করা হয়েছিল এবং এর দায় অন্তর্বতী সরকারের ওপর চাপানোর চেষ্টা থাকতে পারে। তিনি সাবেক অন্তর্বতী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা (বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী) এবং বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বলেন, রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে অন্তর্বতী সরকারকে এই চুক্তির দায় দেওয়ার জন্যই নির্বাচনের ঠিক আগে চুক্তিটি করা হয়ে থাকতে পারে বলে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে।

উপদেষ্টা ফরিদা আকতার বলেছেন বিষয়টি উপদেষ্টা পরিষদে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তাহলে আসিফ নজরুল বা সজিব ভুইয়া জানেন না বিভাবে। অবশ্য কিচেন কেবিনেটের বিষয়টি ইদানিং সবার মুখে মুখে। সাবেক উপদেষ্টা ড. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, প্রতি মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টাসহ বিশেষ কয়েকজন উপদেষ্টা বসে সব সিদ্ধান্ত নিতেন। অন্যরা এসব সিদ্ধান্তের বিষয়ে কিছুই জানতেন না।

শেখ হাসিনার অতীত হুঁশিয়ারি এবং ক্ষমতার সমীকরণ : এই বাণিজ্য চুক্তিকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিগত দিনগুলোর কিছু বিস্ফোরক বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। দেশ ছাড়ার আগে এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন বার্তায় শেখ হাসিনা দাবি করেছিলেন যে, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ কিংবা বঙ্গোপসাগরে মার্কিন একাধিপত্য মেনে না নেওয়া এবং তাদের কৌশলগত কিছু শর্তে রাজি না হওয়ার কারণেই তাকে ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়েছে। আমেরিকার শর্ত মেনে নিলে বা বাণিজ্য ও কৌশলগত চুক্তিগুলোতে সই করলে হয়তো আমাকে ক্ষমতা ছাড়তে হতো না।

আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ, শেখ হাসিনা দেশের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিতে রাজি হননি বলেই মার্কিন প্রশাসন ড. ইউনূসের অন্তর্বতী সরকারকে ক্ষমতায় বসাতে পেছন থেকে কলকাঠি নেড়েছে। আর এখন ইউনূস সরকার সেই ‘নেপথ্য ঋণের’ কিস্তি শোধ করতেই মার্কিন স্বার্থের অনুকূলে এই গোপন বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করেছে।

 এই চুক্তির পর ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক সমালোচনা তৈরি হয়েছে। একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকার কেন এত বড় একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি করার আগে দেশের রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সমাজ বা নাগরিক সমাজের সাথে কোনো আলোচনা বা মতবিনিময় করল না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পশ্চিমা শক্তির প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী দেশের অর্থনৈতিক নীতি সাজানোর যে প্রবণতা বর্তমান সরকারের মধ্যে দেখা যাচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের সার্বভৌম অর্থনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ যখন একটি ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়ন ইতিবাচক হতে পারত। কিন্তু সম্পূর্ণ গোপনীয়তা রক্ষা করে, দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ণকারী শর্তসমূহ মেনে এবং প্রধান রাজনৈতিক অংশীজনদের অন্ধকারে রেখে এই ধরণের চুক্তি করার কারণে ইউনূস সরকারের উদ্দেশ্য ও নিরপেক্ষতা এখন বড় ধরনের রাজনৈতিক ও নৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।