রোববার সন্ধ্যায় ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর ভারতের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে আটকে দেয়। কূটনৈতিক পাসপোর্ট এবং পূর্বঘোষিত সফর হওয়া সত্ত্বেও তাকে ক্লিয়ারেন্স না দিয়ে দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা বিমানবন্দরে বসিয়ে রাখা হয়।
কূটনৈতিক প্রটোকল থাকার পরও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পলিসি, স্ট্র্যাটেজি এবং তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনায় ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।
ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক জোটের বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিতে যাওয়া একজন শীর্ষস্থানীয় উপদেষ্টাকে আড়াই ঘণ্টা আটকে রাখার এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পর্দার আড়ালে গভীর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও ‘রহস্য’ দানা বাঁধছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সোমবার (১৫ জুন) থেকে দিল্লিতে শুরু হওয়া আইওআরএ-র জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দুই দিনব্যাপী বৈঠকে যোগ দিতে রোববার (১৪ জুন) সন্ধ্যায় দিল্লিতে পৌঁছান উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। শুক্রবারই নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে উপদেষ্টার সফর ও প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়টি অবহিত করেছিল।
ইমিগ্রেশনে নাটকীয়তা: রোববার সন্ধ্যায় ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর ভারতের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে আটকে দেয়। কূটনৈতিক পাসপোর্ট এবং পূর্বঘোষিত সফর হওয়া সত্ত্বেও তাকে ক্লিয়ারেন্স না দিয়ে দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা বিমানবন্দরে বসিয়ে রাখা হয়।
উচ্চ মহলের হস্তক্ষেপ ও অভিমানী প্রত্যাখ্যান: বিষয়টি নিয়ে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন এবং ভারতের সাউথ ব্লকের উচ্চ পর্যায়ে জরুরি যোগাযোগ শুরু হলে একপর্যায়ে দিল্লির ‘উচ্চ মহলের’ নির্দেশে তাকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। তবে আড়াই ঘণ্টার এই ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ আচরণে ক্ষুব্ধ ও অপমানিত বোধ করায় উপদেষ্টা আর দিল্লিতে প্রবেশ না করার সিদ্ধান্ত নেন।
কলম্বো হয়ে ঢাকা প্রত্যাবর্তন: আত্মসম্মান ও কূটনৈতিক প্রটোকলের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান নিয়ে তিনি রাতেই দিল্লির বিমানবন্দর থেকে কলম্বোগামী একটি ফ্লাইটে ওঠেন। আজ সোমবার দুপুরের আগেই কলম্বো ট্রানজিট হয়ে তার ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলোর মতে, এই ঘটনাটি কেবল ইমিগ্রেশনের সাধারণ কোনো ‘টেকনিক্যাল ত্রুটি’ নয়। এর পেছনে কয়েকটি গভীর কারণ থাকতে পারে: ভারতের ব্যুরো অব ইমিগ্রেশন অনেক সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সবুজ সংকেত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে মাঠ পর্যায়ে পৌঁছাতে দেরি করে। তবে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার মতো হাই-প্রোফাইল ব্যক্তির ক্ষেত্রে এমন ‘যোগাযোগের অভাব’ বিরল। সাম্প্রতিক সময়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির কারণে দিল্লি ঢাকাকে কোনো প্রচ্ছন্ন ‘বার্তা’ দিতে চেয়েছে কি না, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে মৃদু গুঞ্জন রয়েছে।
জাহেদ উর রহমান একাধারে প্রধানমন্ত্রীর পলিসি, স্ট্র্যাটেজি এবং তথ্য উপদেষ্টা। ভারতের কিছু থিঙ্কট্যাংক বা নীতিনির্ধারক মহলের সাথে সাম্প্রতিক কোনো বিষয়ে নীতিগত মতদ্বৈধতা এই ‘রহস্যজনক’ বাধার কারণ হতে পারে। কূটনৈতিক পত্রে আগাম জানানোর পরও সার্ক বা আইওআরএ ভুক্ত কোনো দেশের শীর্ষ উপদেষ্টাকে এভাবে বিমানবন্দরে বসিয়ে রাখা নজিরবিহীন। এটি পরিষ্কারভাবে প্রটোকল লঙ্ঘন। ভারতের উচ্চ মহল পরে অনুমতি দিলেও, বাংলাদেশের উপদেষ্টার তাৎক্ষণিক দিল্লি ত্যাগের সিদ্ধান্তটি ঢাকার পক্ষ থেকে একটি শক্ত আত্মমর্যাদাপূর্ণ কূটনৈতিক জবাব।
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নয়াদিল্লির সাউথ ব্লক কিংবা ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তবে আইওআরএ-র মতো একটি বহুপাক্ষিক ফোরামে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের প্রধানের অনুপস্থিতি দিল্লির কূটনৈতিক আয়োজকদের জন্য অস্বস্তিকর।
এই ঘটনার পর বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে সাময়িক শীতলতা তৈরি হতে পারে। কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘনের এই ‘রহস্যজনক’ অধ্যায়টি ঢাকা কীভাবে দিল্লির কাছে উত্থাপন করে এবং ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর কী ব্যাখ্যা দেয়—তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি।



