মূল কনটেন্টে যান
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
ঢাকা
--:--
সিডনি
--:--
ব্রেকিং
হবিগঞ্জে এনসিপির পদযাত্রায় হামলা, সারজিস-নাসীরুদ্দীন আহতপশ্চিম সিডনিতে নতুন জাতীয় উদ্যান: সেন্টেনিয়াল পার্কের চেয়ে তিনগুণ বড় এক সবুজ বিপ্লবশাপলা চত্বর ঘটনা: শেখ হাসিনা ও বেনজীরসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চার্জ গঠনআইসিসির পরোয়ানা তোয়াক্কা না করে ওয়াশিংটনে নেতানিয়াহু; ট্রাম্পের সাথে রেকর্ড বৈঠকবাংলাদেশসহ ৬০ দেশের উপর ট্রাম্পের নতুন শুল্ক, তালিকায় আছে কোন কোন দেশ  পদত্যাগের প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি: ‘প্রশ্নটা বিব্রতকরহবিগঞ্জে এনসিপির পদযাত্রায় হামলা, সারজিস-নাসীরুদ্দীন আহতপশ্চিম সিডনিতে নতুন জাতীয় উদ্যান: সেন্টেনিয়াল পার্কের চেয়ে তিনগুণ বড় এক সবুজ বিপ্লবশাপলা চত্বর ঘটনা: শেখ হাসিনা ও বেনজীরসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চার্জ গঠনআইসিসির পরোয়ানা তোয়াক্কা না করে ওয়াশিংটনে নেতানিয়াহু; ট্রাম্পের সাথে রেকর্ড বৈঠকবাংলাদেশসহ ৬০ দেশের উপর ট্রাম্পের নতুন শুল্ক, তালিকায় আছে কোন কোন দেশ  পদত্যাগের প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি: ‘প্রশ্নটা বিব্রতকর
বিবিধ খবর

লাল-সবুজের পাহাড়ি কন্যা: বীর মুক্তিযোদ্ধা কাঁকন বিবি

স্টাফ রিপোর্টার ১ মাস আগে মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬ ১২৮ বার পঠিত

কাঁকন বিবি কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও নারী বীরত্বের এক জীবন্ত প্রতীক। খাসিয়া সম্প্রদায়ের হয়েও বাংলাদেশের মাটিকে নিজের দেশ ভেবে তিনি যে আত্মত্যাগ করেছেন, তা চিরকাল প্রতিটি বাংলাদেশির হৃদয়ে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

একাত্তরের রণাঙ্গনে কত মানুষের রক্ত আর আত্মত্যাগ মিশে আছে, তার হিসাব মেলানো ভার। কিন্তু কিছু নাম ইতিহাসের পাতায় এত উজ্জ্বল যে, সময়ের ধুলো তাদের ম্লান করতে পারে না। এমনই এক নাম—কাঁকন বিবি। খাসিয়া সম্প্রদায়ের এই পাহাড়ি নারী সব বাধা পেরিয়ে হয়ে উঠেছিলেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এক মূর্তিমান আতঙ্ক।

শিকড়ের খোঁজে: কাঁকাত হেনিনচিতা থেকে কাঁকন বিবি

কাঁকন বিবির আসল নাম ছিল কাঁকাত হেনিনচিতা। ভারতের খাসিয়া পাহাড়ের পাদদেশের এক প্রত্যন্ত গ্রামে তার জন্ম। খাসিয়া সম্প্রদায়ের এই মেয়েটির জীবন চিরকাল এক জায়গায় থিতু ছিল না। সত্তরের দশকের শুরুতে এক বাঙালি জোয়ান মজিদ খানের সাথে তার বিয়ে হয় এবং তিনি চলে আসেন বাংলাদেশে। বিয়ের পর তার নতুন নাম হয় কাঁকন বিবি। কিন্তু সুখের সংসার তার কপালে বেশিদিন সইলো না। এক কন্যাসন্তানের (সখিনা) জন্ম দেওয়ার পরপরই স্বামী মজিদ তাকে ফেলে রেখে চলে যান।

মেয়ের খোঁজে কাঁকন বিবি যখন সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার টেংরাটিলা ক্যাম্পে পৌঁছান, ততদিনে ১৯৭১ সালের মার্চ এসে গেছে। চারিদিকে যুদ্ধের দামামা। আর এই যুদ্ধই তাঁর জীবনের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেয়।

গুপ্তচর থেকে ‘মুক্তিবেটি’: অকুতোভয় সেই দিনগুলো

নিজের ব্যক্তিগত দুঃখকে পাশে সরিয়ে রেখে কাঁকন বিবি যুক্ত হন ৫ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে। সেক্টর কমান্ডার মীর শওকত আলী তার সাহস দেখে মুগ্ধ হন। পাকিস্তানি বাহিনীর ভেতরের খবর এনে দেওয়ার জন্য কাঁকন বিবিকে বেছে নেওয়া হয় গুপ্তচর হিসেবে।

ছদ্মবেশে শত্রুশিবিরে

 কাঁকন বিবি কখনো ভিক্ষুক, কখনো পাগল, আবার কখনো কলা বিক্রেতার ছদ্মবেশে পাকিস্তানি ক্যাম্পে ঢুকে যেতেন। পাকিস্তানি সেনারা তাকে সামান্য এক পাহাড়ি নারী ভেবে পাত্তা দিত না, আর এই সুযোগেই তিনি ক্যাম্পের ভেতরের রসদ, সৈন্যসংখ্যা ও বাঙ্কারের গোপন তথ্য মুক্তিযোদ্ধাদের এনে দিতেন।

বন্দীশালা নির্যাতন

তথ্য পাচারের সময় একবার পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ধরা পড়েন তিনি। দিনের পর দিন তার ওপর চলে অমানুষিক ও পাশবিক নির্যাতন। কিন্তু শত নির্যাতনেও এই বীর নারী মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো গোপন তথ্য শত্রুদের কাছে ফাঁস করেননি। পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধাদের এক আকস্মিক আক্রমণে তিনি মুক্ত হন।

সম্মুখ সমরের যোদ্ধা

নির্যাতন কাঁকন বিবিকে দমাতে পারেনি, বরং তার ভেতরের প্রতিশোধের আগুনকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি কেবল তথ্য দিয়েই ক্ষান্ত হননি, অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ নিয়ে সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন। আমবাড়ি, টেংরাটিলা, বালিউরাসহ প্রায় ২০টি সফল অপারেশনে তিনি বীরত্বের সাথে লড়াই করেন। যুদ্ধের একপর্যায়ে তিনি গুলিবিদ্ধও হন, কিন্তু তাও তাকে রণক্ষেত্র থেকে সরাতে পারেনি। সহযোদ্ধা ও স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি পরিচিতি পান ‘মুক্তিবেটি’ নামে।”আমি তো দেশের জন্যই লড়ছিলাম। পাকিস্তানিরা আমারে মারতে চাইছে, কিন্তু আল্লায় আমারে বাঁচাইয়া রাখছে এই স্বাধীন দেশ দেখার লাইগা।” — এক সাক্ষাৎকারে কাঁকন বিবি

উপেক্ষিত বীরত্ব শেষ জীবন

দেশ স্বাধীন হলেও কাঁকন বিবির ত্যাগের মূল্যায়ন হতে অনেক সময় লেগেছে। দীর্ঘদিন তিনি লোকচক্ষুর অন্তরালে, চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার তার বীরত্বকে স্বীকৃতি দেয় এবং তাকে বীর প্রতীক’ উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণা দেওয়া হয় (যদিও সরকারি গ্যাজেট প্রাপ্তিতে কিছুটা সময় লেগেছিল)।

২০১৮ সালের ২১ মার্চ সিলেটের এক হাসপাতালে এই মহান জননী ও বীর যোদ্ধা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে দোয়ারাবাজারে সমাহিত করা হয়। কাঁকন বিবি কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও নারী বীরত্বের এক জীবন্ত প্রতীক। খাসিয়া সম্প্রদায়ের হয়েও বাংলাদেশের মাটিকে নিজের দেশ ভেবে তিনি যে আত্মত্যাগ করেছেন, তা চিরকাল প্রতিটি বাংলাদেশির হৃদয়ে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ‘  কাঁকাত হেনিনচিতা’ থেকে ‘মুক্তিবেটি’ হয়ে ওঠার এই গল্প প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রেরণা জোগাবে।একাত্তরের রণাঙ্গনে কত মানুষের রক্ত আর আত্মত্যাগ মিশে আছে, তার হিসাব মেলানো ভার। কিন্তু কিছু নাম ইতিহাসের পাতায় এত উজ্জ্বল যে, সময়ের ধুলো তাদের ম্লান করতে পারে না। এমনই এক নাম—কাঁকন বিবি। খাসিয়া সম্প্রদায়ের এই পাহাড়ি নারী সব বাধা পেরিয়ে হয়ে উঠেছিলেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এক মূর্তিমান আতঙ্ক।

শিকড়ের খোঁজে: কাঁকাত হেনিনচিতা থেকে কাঁকন বিবি

কাঁকন বিবির আসল নাম ছিল কাঁকাত হেনিনচিতা। ভারতের খাসিয়া পাহাড়ের পাদদেশের এক প্রত্যন্ত গ্রামে তার জন্ম। খাসিয়া সম্প্রদায়ের এই মেয়েটির জীবন চিরকাল এক জায়গায় থিতু ছিল না। সত্তরের দশকের শুরুতে এক বাঙালি জোয়ান মজিদ খানের সাথে তার বিয়ে হয় এবং তিনি চলে আসেন বাংলাদেশে। বিয়ের পর তার নতুন নাম হয় কাঁকন বিবি। কিন্তু সুখের সংসার তার কপালে বেশিদিন সইলো না। এক কন্যাসন্তানের (সখিনা) জন্ম দেওয়ার পরপরই স্বামী মজিদ তাকে ফেলে রেখে চলে যান। মেয়ের খোঁজে কাঁকন বিবি যখন সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার টেংরাটিলা ক্যাম্পে পৌঁছান, ততদিনে ১৯৭১ সালের মার্চ এসে গেছে। চারিদিকে যুদ্ধের দামামা। আর এই যুদ্ধই তাঁর জীবনের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেয়।

গুপ্তচর থেকে ‘মুক্তিবেটি’: অকুতোভয় সেই দিনগুলো

নিজের ব্যক্তিগত দুঃখকে পাশে সরিয়ে রেখে কাঁকন বিবি যুক্ত হন ৫ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে। সেক্টর কমান্ডার মীর শওকত আলী তার সাহস দেখে মুগ্ধ হন। পাকিস্তানি বাহিনীর ভেতরের খবর এনে দেওয়ার জন্য কাঁকন বিবিকে বেছে নেওয়া হয় গুপ্তচর হিসেবে।

ছদ্মবেশে শত্রুশিবিরে

 কাঁকন বিবি কখনো ভিক্ষুক, কখনো পাগল, আবার কখনো কলা বিক্রেতার ছদ্মবেশে পাকিস্তানি ক্যাম্পে ঢুকে যেতেন। পাকিস্তানি সেনারা তাকে সামান্য এক পাহাড়ি নারী ভেবে পাত্তা দিত না, আর এই সুযোগেই তিনি ক্যাম্পের ভেতরের রসদ, সৈন্যসংখ্যা ও বাঙ্কারের গোপন তথ্য মুক্তিযোদ্ধাদের এনে দিতেন।

বন্দীশালা নির্যাতন

তথ্য পাচারের সময় একবার পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ধরা পড়েন তিনি। দিনের পর দিন তার ওপর চলে অমানুষিক ও পাশবিক নির্যাতন। কিন্তু শত নির্যাতনেও এই বীর নারী মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো গোপন তথ্য শত্রুদের কাছে ফাঁস করেননি। পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধাদের এক আকস্মিক আক্রমণে তিনি মুক্ত হন।

সম্মুখ সমরের যোদ্ধা

নির্যাতন কাঁকন বিবিকে দমাতে পারেনি, বরং তার ভেতরের প্রতিশোধের আগুনকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি কেবল তথ্য দিয়েই ক্ষান্ত হননি, অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ নিয়ে সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন। আমবাড়ি, টেংরাটিলা, বালিউরাসহ প্রায় ২০টি সফল অপারেশনে তিনি বীরত্বের সাথে লড়াই করেন। যুদ্ধের একপর্যায়ে তিনি গুলিবিদ্ধও হন, কিন্তু তাও তাকে রণক্ষেত্র থেকে সরাতে পারেনি। সহযোদ্ধা ও স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি পরিচিতি পান ‘মুক্তিবেটি’ নামে।”আমি তো দেশের জন্যই লড়ছিলাম। পাকিস্তানিরা আমারে মারতে চাইছে, কিন্তু আল্লায় আমারে বাঁচাইয়া রাখছে এই স্বাধীন দেশ দেখার লাইগা।” — এক সাক্ষাৎকারে কাঁকন বিবি

উপেক্ষিত বীরত্ব শেষ জীবন

দেশ স্বাধীন হলেও কাঁকন বিবির ত্যাগের মূল্যায়ন হতে অনেক সময় লেগেছে। দীর্ঘদিন তিনি লোকচক্ষুর অন্তরালে, চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার তার বীরত্বকে স্বীকৃতি দেয় এবং তাকে বীর প্রতীক’ উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণা দেওয়া হয় (যদিও সরকারি গ্যাজেট প্রাপ্তিতে কিছুটা সময় লেগেছিল)।

২০১৮ সালের ২১ মার্চ সিলেটের এক হাসপাতালে এই মহান জননী ও বীর যোদ্ধা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে দোয়ারাবাজারে সমাহিত করা হয়। কাঁকন বিবি কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও নারী বীরত্বের এক জীবন্ত প্রতীক। খাসিয়া সম্প্রদায়ের হয়েও বাংলাদেশের মাটিকে নিজের দেশ ভেবে তিনি যে আত্মত্যাগ করেছেন, তা চিরকাল প্রতিটি বাংলাদেশির হৃদয়ে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ‘  কাঁকাত হেনিনচিতা’ থেকে ‘মুক্তিবেটি’ হয়ে ওঠার এই গল্প প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রেরণা জোগাবে।