পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সরকারি ও বেসরকারি প্রসূতি হাসপাতালগুলো থেকে সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুদের ‘প্লেসেন্টা’ বা গর্ভফুল চুরির এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রসূতি মা ও তাদের পরিবারকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে হাসপাতালের একশ্রেণির অসাধু কর্মী এই পাচার চক্রের সাথে জড়িয়ে পড়েছেন।
যেভাবে কাজ করে এই চক্র
হাসপাতালে সন্তান প্রসবের পর সাধারণত চিকিৎসাবর্জ্য হিসেবে গর্ভফুল ফেলে দেওয়ার কথা। কিন্তু এই চক্রের সদস্যরা অত্যন্ত গোপনে সেগুলো সংগ্রহ করে।
মূল হোতা: হাসপাতালের ওয়ার্ড বয়, আয়া, ধাত্রী এবং কিছু ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সরাসরি এই চুরির সাথে জড়িত।

গোপন চুক্তি: হাসপাতালের এই নিম্নপদস্থ কর্মীরা প্রসূতির পরিবারকে বলেন যে, গর্ভফুলটি “বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া হয়েছে” অথবা “হাসপাতালের নিয়ম অনুযায়ী ধ্বংস করা হয়েছে”। কিন্তু বাস্তবে সেগুলো বিশেষ ফ্রিজার বা কোল্ড বক্সে লুকিয়ে ফেলা হয়।
সংগ্রহ ও বিক্রি: পরবর্তীতে মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালদের মাধ্যমে এই গর্ভফুলগুলো চড়া দামে বিক্রি করে দেওয়া হয়। কেনএই গর্ভফুলের এত চাহিদা?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক এবং স্থানীয়ভাবে প্রসাধনএবং ঐতিহ্যবাহী ওষুধ তৈরিতে এই মানব প্লেসেন্টার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। গর্ভফুলে প্রচুর পরিমাণে কোলাজেন, প্রোটিন এবং স্টেম সেল থাকে। আন্তর্জাতিক বাজারে বয়সের ছাপ দূর করার (Anti-aging) দামি ক্রিম ও সিরাম তৈরিতে এটি ব্যবহৃত হয়। কিছু নির্দিষ্ট থেরাপি এবং হরমোনের ওষুধ তৈরিতেও এর ব্যবহার রয়েছে। আইনি ও নৈতিক নিষেধাজ্ঞা থাকায় বৈধ উপায়ে এটি পাওয়া অসম্ভব। ফলে ল্যাবরেটরি এবং প্রসাধন প্রস্তুতকারকদের একাংশ কালোবাজার থেকে চড়া মূল্যে এগুলো কিনে নেয়।
আইনি ও নৈতিক সংকট
পাকিস্তানের চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী, মানবদেহের যেকোনো অঙ্গ বা টিস্যু অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পুড়িয়ে (Incineration) ধ্বংস করার কথা। কিন্তু আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকায় এবং নজরদারির অভাবে এই চক্রটি অবাধে কাজ করে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল আইনি অপরাধই নয়, বরং চরম নৈতিক অবক্ষয়। একজন মায়ের অজান্তে তার শরীরের অংশ এভাবে বিক্রি করে দেওয়া মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও পদক্ষেপ
প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর সিন্ধু প্রদেশের স্বাস্থ্য বিভাগে তোলপাড় শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হাসপাতালগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে এবং সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে জড়িত কর্মীদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। এ ধরনের জঘন্য অপরাধের সাথে জড়িতদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে প্রশাসন।
উৎস: দি এক্সপ্রেস ট্রিবিউন (পাকিস্তান)-এ প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।



