২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে এবার ইতিহাস গড়েছে নরওয়ে। প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালের লড়াইয়ে নামছে তারা। তবে এই সাফল্যকে কোনো আকস্মিক ঘটনা মনে করছেন না দেশটির ফুটবল কর্মকর্তারা। দীর্ঘ এক দশকের পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং খেলোয়াড় তৈরির নতুন দর্শনই নরওয়ের এই উত্থানের ভিত্তি।
নরওয়েজিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের খেলোয়াড় উন্নয়ন বিভাগের প্রধান হাকন গ্রটল্যান্ড জানান, ২০১৩ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারা দেশের ফুটবল কাঠামো আমূল বদলে দেন। তার নেতৃত্বেই চালু হয় ন্যাশনাল টিম স্কুল (এনটিএস), যেখান থেকে বর্তমান বিশ্বকাপ দলে থাকা অধিকাংশ ফুটবলার উঠে এসেছেন।
গ্রটল্যান্ডই প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন বর্তমান অধিনায়ক মার্টিন ওদেগার্ডকে। তিনি জানান, ওদেগার্ডের অসাধারণ প্রতিভার কারণে দেশের প্রচলিত নিয়মও বদলাতে হয়েছিল।
তার ভাষায়, “১২ বছরের আগে কোনো খেলোয়াড়কে জাতীয় পর্যায়ে বাছাই না করার নিয়ম ছিল। কিন্তু মার্টিন এতটাই অসাধারণ ছিল যে তার জন্য সেই নিয়ম পরিবর্তন করতে হয়েছিল। সে ছিল সত্যিকারের প্রতিভা।”
ওদেগার্ডকে ঘিরেই নরওয়ে প্রতিভা মূল্যায়নের নতুন দর্শন তৈরি করে। সেখানে শারীরিক সক্ষমতার চেয়ে একজন খেলোয়াড় নিজের উন্নয়নের দায়িত্ব কতটা নিতে পারে, সেটিকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়।
শুধু খেলোয়াড় নয়, অবকাঠামো উন্নয়নেও বড় বিনিয়োগ করেছে নরওয়ে। গত এক দশকে দেশজুড়ে ৫৩৯টি নতুন কৃত্রিম টার্ফ মাঠ নির্মাণ এবং আরও ৫৮৬টি মাঠ সংস্কার করা হয়েছে, যাতে সারা বছরই ফুটবল খেলা সম্ভব হয়। পাশাপাশি কোচ তৈরিতেও ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে ফুটবল ফেডারেশন।
সাবেক এফকে বোদো/গ্লিমট একাডেমি পরিচালক গ্রেগ ব্রটন বলেন, নরওয়ে অন্য দেশের মডেল অনুকরণ না করে নিজেদের বাস্তবতা অনুযায়ী পরিকল্পনা করেছে। ক্লাবগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, খেলোয়াড়দের ব্যক্তিত্ব গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ছিল সেই পরিকল্পনার মূল ভিত্তি।
বর্তমান কোচ স্টালে সোলবাকেন–এর দলে থাকা তারকাদের মধ্যে শুধু আর্লিং হালান্ড বা ওদেগার্ডই নন, প্যাট্রিক বার্গ ও আন্তোনিও নুসাররাও সমানভাবে আলো ছড়াচ্ছেন। নরওয়ের ফুটবল সংস্কৃতিতে দলীয় ঐক্য ও নম্রতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
গ্রটল্যান্ড বলেন, “আমরা এখন প্রতিভাকে শুধু দৌড়ানোর ক্ষমতা দিয়ে বিচার করি না। মানসিকতা, শেখার আগ্রহ এবং দলের জন্য কাজ করার ইচ্ছাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দলে কোনো অহংকারী নেই, সবাই ইতিবাচক মানসিকতার।”
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের ফল যাই হোক না কেন, নরওয়ের বিশ্বাস তাদের ফুটবল বিপ্লবের শুরু মাত্র। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফল হিসেবে আগামী বছরগুলোতে আরও অনেক প্রতিভাবান ফুটবলার উঠে আসবে বলে আশাবাদী দেশটির ফুটবল সংশ্লিষ্টরা।



