আওয়ামী লীগ সভাপতি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা এক শোকবিবৃতিতে বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সাবেক মন্ত্রী ও গণপরিষদ সদস্য, জাতীয় নেতা তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে বাংলাদেশ হারালো একজন উজ্জ্বল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একজন পরীক্ষিত, ত্যাগী ও দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতাকে হারালো। ঢাকা : বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত কিংবদন্তি, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং প্রবীণ রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না লিল্লাহি রাজিউন)। সোমবার (১ জুন ) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইজডসহ বার্ধক্যজনিত নানাবিধ জটিলতায় ভুগছিলেন এই বর্ষীয়ান নেতা। গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে নি স্কয়ার হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। তিনি একমাত্র কন্যাসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন। ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া তোফায়েল আহমেদ ষাটের দশকের ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে এসে হয়ে উঠেছিলেন বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। ছাত্র আন্দোলন থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি: ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ : তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সময় ছিল ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার তেজোদীপ্ত ও আপসহীন নেতৃত্বে ১৯৬৯-এর গণ-আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়, যা আইয়ুব খানের সামরিক জান্তার পতন সুনিশ্চিত করেছিল। এই আন্দোলনের সফলতার ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক বিশাল ছাত্র-জনতার সমাবেশে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন তরুণ ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ। এই একটি ঘটনাই তাকে বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় অমর করে রেখেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধ ও তোফায়েল আহমেদ: সম্মুখ সমরের সংগঠক : ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তোফায়েল আহমেদের ভূমিকা ছিল অনন্য ও বহুমুখী। তিনি কেবল রাজনৈতিক নেতাই ছিলেন না, বরং যুদ্ধের মাঠে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান গেরিলা বাহিনী ‘মুজিব বাহিনী’ (বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সেস ) গঠনে তিনি ছিলেন প্রধান চার যুবনেতার একজন। শেখ ফজলুল হক মনি, কাজী আরিফ আহমেদ এবং সিরাজুল আলম খানের সঙ্গে মিলে তিনি এই বাহিনী গড়ে তোলেন এবং এর অন্যতম প্রধান অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। মুজিব বাহিনীর চারজন প্রধান কমান্ডারের একজন হিসেবে তোফায়েল আহমেদের অধীনে ছিল বৃহত্তর বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, ফরিদপুর এবং যশোর অঞ্চল। এই অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সরবরাহ এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরের রণকৌশল তৈরিতে তিনি সরাসরি ভূমিকা রাখেন। ভারত সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে মুক্তিযোদ্ধাদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ এবং যুদ্ধের রসদ জোগাড়ের পাশাপাশি পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে শরণার্থীদের আশ্রয় ও পুনর্বাসনে তিনি দিনরাত কাজ করেছেন। সংসদীয় রাজনীতি ও মন্ত্রিত্বের দীর্ঘ পথচলা : স্বাধীনতার ঠিক আগে, ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে চমক লাগিয়েছিলেন তোফায়েল আহমেদ। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি মোট নয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তিনি বাণিজ্য ও শিল্পসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অন্যতম নীতিনির্ধারক ও উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য। একটি যুগের অবসান : তোফায়েল আহমেদের প্রয়াণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হলো। তিনি এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধি ছিলেন, যারা পদের জন্য রাজনীতি করেননি, বরং রাজনীতিকে দেশের স্বাধীনতা ও মানুষের অধিকার আদায়ের হাতিয়ার করেছিলেন। আওয়ামী লীগ সভাপতি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার শোক : আওয়ামী লীগ সভাপতি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা এক শোকবিবৃতিতে বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সাবেক মন্ত্রী ও গণপরিষদ সদস্য, জাতীয় নেতা তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে বাংলাদেশ হারালো একজন উজ্জ্বল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একজন পরীক্ষিত, ত্যাগী ও দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতাকে হারালো। ছাত্রজীবন থেকে তিনি বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অসামান্য অবদান রেখেছেন এবং তিনি ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর, স্নেহধন্য এবং ঐতিহাসিক ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক।’ শোক বিবৃতিতে শেখ হাসিনা আরও উল্লেখ করেন, ‘স্বাধীনতা পরবর্তী রাষ্ট্রগঠন, গণতন্ত্র এবং মুক্তিযুদ্ধ পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তোফায়েল আহমেদের অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে; দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি জনগণের কল্যাণ, উন্নয়ন ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন’ এবং তিনি যোগ করেন, ‘তোফায়েল আহমেদের প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা এবং আদর্শের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে এবং তার মৃত্যুতে দেশের রাজনীতি, বিশেষত আওয়ামী লীগ পরিবারে যে শূন্যতার সৃষ্টি হলো, তা অপূরণীয়।’ Post navigation আমাদের ইরানে যাওয়া উচিত হয়নি : ট্রাম্প চিরনিদ্রায় শায়িত প্রবীণ রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ