বিগত দেড় দশকে পদোন্নতি না পাওয়া বা ‘ওএসডি’ হয়ে থাকা কর্মকর্তাদের গণহারে পুনর্বাসন ও পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। শত শত কর্মকর্তাকে একসঙ্গে পদোন্নতি দিয়ে পুলিশের ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি এবং এসপি পদে বসানো হয়েছে। ঢাকা : ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে যে প্রতিষ্ঠানটির আমূল সংস্কারের জন্য সবচেয়ে বেশি ধোঁয়া তোলা হয়েছিল, সেটি হলো ‘বাংলাদেশ পুলিশ’। ৫ই আগস্টের সংস্কারের নামে ভেঙে পড়া চেইন অফ কমান্ড পুনর্গঠন এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অন্তর্র্বতী ও পরবর্তী বিএনপি সরকারের অধীনে পুলিশে ব্যাপক রদবদল করা হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্র-পত্রিকা, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে— পুলিশকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ করার নামে কার্যত ভিন্ন এক রাজনৈতিক মেরুকরণের দিকে মোড় নিয়েছে। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন তীব্র গুঞ্জন— পুলিশ কি তবে এখন ‘বিএনপি-জামায়াত বলয়ে’ প্রবেশ করেছে? ‘বঞ্চিত’ তকমায় ঢালাও পদোন্নতি ও রাজনৈতিক পদায়ন : অভ্যুত্থানের পর থেকে পুলিশ সদর দপ্তর এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একের পর এক প্রজ্ঞাপনে দেখা গেছে, বিগত দেড় দশকে পদোন্নতি না পাওয়া বা ‘ওএসডি’ হয়ে থাকা কর্মকর্তাদের গণহারে পুনর্বাসন ও পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। শত শত কর্মকর্তাকে একসঙ্গে পদোন্নতি দিয়ে পুলিশের ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি এবং এসপি পদে বসানো হয়েছে। রাজনৈতিক ট্যাগ: প্রশাসনিকভাবে একে “বঞ্চনা দূরীকরণ” বলা হলেও, মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন। পদোন্নতি পাওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ জেলা ও মেট্রোপলিটনে পোস্টিং পাওয়া কর্মকর্তাদের বড় অংশের অতীত ব্যাকগ্রাউন্ড বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তারা ছাত্রজীবনে বা পারিবারিক সূত্রে বিএনপি-র ছাত্রসংগঠন ‘ছাত্রদল’ বা জামায়াতের ‘ছাত্রশিবির’-এর রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। ফলে, পেশাদারত্বের চেয়ে ‘রাজনৈতিক পরিচয়’ পদায়নের প্রধান মাপকাঠি হয়ে উঠেছে বলে নীতি-বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন। বিএনপি-জামায়াত নেতাদের বক্তব্য এবং মাঠ প্রশাসনে প্রভাব : পুলিশের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ যে বৃদ্ধি পেয়েছে, তা স্পষ্ট হয়েছে বিভিন্ন সময়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের দেওয়া বক্তব্য থেকে। সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর চট্টগ্রাম অঞ্চলের এক জনসভায় এক নেতার বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচিত হয়, যেখানে তিনি বলেছিলেন— “প্রশাসনকে আমাদের কথামতো চলতে হবে, জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে হবে।”এই ধরনের রাজনৈতিক চাপের সরাসরি প্রভাব দেখা যাচ্ছে দেশের থানাগুলোতে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রাপ্ত তথ্য এবং জাতীয় দৈনিকগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়োগ বা বদলিতে স্থানীয় বিএনপি বা জামায়াত নেতাদের ‘ক্লিয়ারেন্স’ বা সুপারিশ একটি অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। এর ফলে পুলিশ কর্মকর্তারা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সন্তুষ্ট রাখতে বেশি সচেষ্ট থাকছেন। একপাক্ষিক মামলা ও ‘সিলেক্টিভ’ গ্রেপ্তার অভিযান : বিগত সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে হাজার হাজার রাজনৈতিক মামলা দায়ের করা হয়েছে, যেখানে অনেক ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়াই ঢালাওভাবে শত শত সাংবাদিকসহ হাজার হাজার মানুষকে আসামি করা হয়েছে | রাজনৈতিক মামলাগুলোকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে সরকারের অনুগত পুলিশ কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দিয়ে সরকার কৌশলে আয়োমী লীগ নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ঘায়েল করার চেষ্টা করছে। এসব মামলায় সরকারের প্রভাবশালী মহল এবং বিএনপি-জামাত এর প্রভাবশালী নেতাদের মাধ্যমে মামলার এজাহার থেকে নাম বাদ দেওয়া, রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করতে নতুন করে পুরোনো মামলায় নাম সংযোজন, মামলা ছাড়া গ্রেফতার ও নির্যাতন অব্যাহত রেখেছে। অপারেশন ও একপাক্ষিক অ্যাকশন: সমসাময়িক বিশেষ অভিযানগুলোতে দেখা গেছে, গ্রেপ্তারের সিংহভাগই বিগত সরকারের নেতাকর্মী বা সমর্থক। কিন্তু বর্তমান শাসকদল বা প্রভাবশালী জোটের ক্যাডাররা যখন চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব বা সহিংসতায় লিপ্ত হচ্ছে, তখন পুলিশকে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে দেখা যাচ্ছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ তাদের বিবৃতিতে পুলিশের এই “সিলেক্টিভ আইন প্রয়োগ” নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলা তাদের একাধিক ভিডিও এবং টেক্সট প্রতিবেদনে দেখিয়েছে যে, পুলিশের চেইন অফ কমান্ডের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে থানা ও ফাঁড়িগুলোকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। বিবিসি-র এক বিশ্লেষণে বলা হয়, পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা নিজেদের চাকরি বাঁচাতে বা ভালো পোস্টিং পেতে এখন নতুন রাজনৈতিক শক্তির দিকে ঝুঁকছেন, যা মূলত “পুরানো বোতলে নতুন মদ”-এর মতোই দলীয়করণের ধারাবাহিকতা। কাঠামোগত সংস্কারের ভবিষ্যৎ: বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা : পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে একটি স্বাধীন ‘পুলিশ কমিশন’ গঠনের দাবি দীর্ঘদিনের। অন্তর্র্বতী সরকারের সময় এ লক্ষ্যে একটি সংস্কার কমিশনও গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের রাজনৈতিক বাস্তবতা বলছে, সেই সংস্কার প্রস্তাবগুলো কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। Post navigation সিডনিতে মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে নিহতদের স্মরণে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মোমবাতি প্রজ্বলন ও বিশেষ প্রার্থনা আজ পবিত্র ঈদুল আজহা