রাজাকারের বংশধর ও দোসররা জেনে রাখুক, ঘৃণ্য বিশ্বাসঘাতকতার কারণেই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এতটা দীর্ঘ, রক্তক্ষয়ী এবং যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠেছিল। ঢাকা : চলে গেলেন একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনা টেপরী রাণী। যে সমাজ ও রাষ্ট্র তাঁকে দীর্ঘকাল অবহেলা ও নিগ্রহের পাত্রী করে রেখেছিল, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি পেয়েছেন তাঁর কাঙ্ক্ষিত মর্যাদা। মৃত্যুর পর তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সম্মানে লাল-সবুজের পতাকায় মুড়িয়ে বিদায় জানানো হয়েছে এই মহান বীরকে। টেপরী রাণীর প্রস্থান কেবল একজন মানুষের বিদায় নয়, এটি একাত্তরের অবর্ণনীয় ত্যাগ এবং এক অকুতোভয় উত্তরসূরির জন্মলগ্নের ঐতিহাসিক উপাখ্যান। ৭১-এর সেই রক্তিম ও নারকীয় দিনগুলো : তখন যুদ্ধ চলছে পুরো দমে। টেপরী রাণীর বয়স তখন মাত্র ১৭ বছর। চারদিকে পাকিস্তানি হানাদার আর তাদের দোসর রাজাকারদের তাণ্ডব। পুরো পরিবারের ওপর তখন মৃত্যুর ছায়া। ঠিক তখনই পরিবারকে বাঁচানোর নাম করে কুখ্যাত এক স্থানীয় রাজাকার ত্রাতা সেজে এগিয়ে আসে। সে এসে টেপরীর অসহায় বাবাকে কুপ্রস্তাব দেয়— “তোমার মেয়েকে যদি পাকিস্তানি ক্যাম্পে দাও, তাহলে পুরো পরিবারটা বেঁচে যাবে।” একদিকে পুরো পরিবারের জীবন, অন্যদিকে নিজের কলিজার টুকরো ১৭ বছরের কিশোরী কন্যা। এক চরম অসহায়ত্বের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বাবা বেছে নিলেন নিষ্ঠুরতম পথ। নিজের পরিবারকে রক্ষা করতে টেপরীকে ‘বিসর্জন’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। বাবার সেই চরম অসহায়ত্ব কিশোরী মেয়েও বুঝতে পেরেছিল। সে জানত পাকিস্তানি ক্যাম্পে পা রাখা মানে জমের মুখে যাওয়া, যেখানে তিল তিল করে শেষ হতে হবে। তবু সে কোনো বাধা দেয়নি। সেদিন এক নির্বাক বাবা নিজের মেয়ের হাত ধরে পৌঁছে দিয়ে এসেছিলেন পাকিস্তানি ক্যাম্পে। সারাটা পথ বাবা-মেয়ের মধ্যে একটি কথাও হয়নি। যে মেয়েকে নরপশুদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে, সেখানে কোন সান্ত্বনা বা কোন বিদায়ের ভাষা থাকতে পারে? সেদিন টেপরিকে ক্যাম্পে তুলে দিয়ে মাথা নিচু করে ফিরে আসেন নির্বাক বাবা। নিজের মেয়ের দিকে তাকিয়ে একবার নিজেকে সেই স্থানে বসিয়ে কল্পনা করুন তো, এই নীরবতার গভীরতা কতটা বিষাদময় ও যন্ত্রণার! নরকযন্ত্রণা ও সমাজের নিষ্ঠুর যুদ্ধ : টেপরী রাণী আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতো ক্যাম্পে মরে যেতে পারতেন, কিন্তু তাঁর নিয়তি ছিল দীর্ঘস্থায়ী কষ্টের। দীর্ঘ কড়া ছয়টি মাস ধরে তিনি সহ্য করেছেন অবর্ণনীয় নরকযন্ত্রণা। এমন কোনো রাত পার হয়নি, যেদিন পাকিস্তানি সেনারা তাঁর ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়নি। একাত্তরের এই রক্তক্ষয়ী ইতিহাস কোনো রূপকথা বা মিথ নয়; এই সীমাহীন ও নির্মম ‘বাড়াবাড়ির’ বাস্তব রূপই হলো আমাদের একাত্তর। যুদ্ধ শেষ হলো, দেশ স্বাধীন হলো, কিন্তু টেপরী রাণীর জন্য যুদ্ধ শেষ হলো না। মুক্তিযুদ্ধ শেষে যখন তিনি অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় বাড়ি ফিরলেন, তখন শুরু হলো সমাজের আরেক চরম সামাজিক লাঞ্ছনা ও মানসিক যন্ত্রণা। অনাগত সেই যুদ্ধশিশুকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিল না তথাকথিত ভদ্র সমাজ। চারদিক থেকে সন্তানকে ‘নষ্ট’ করে ফেলার জন্য অনবরত চাপ আসতে থাকে। কিন্তু এই কঠিনতম মুহূর্তে মেয়ের পাশে পাহাড়ের মতোন দৃঢ় হয়ে দাঁড়ান তাঁর সেই বাবা। তিনি বলেছিলেন, “না মা, রাখ। এ-ই হবে তোর সম্বল। তোকে তো আর কেউ গ্রহণ করবে না। শেষ বয়সে এই সন্তানই হবে তোর বেঁচে থাকার অবলম্বন।” সুধীর ও ‘জনতা’: একাত্তরের অবিনশ্বর উত্তরসূরি : বাবার সেই দূরদর্শী কথাই সত্য হয়েছিল। টেপরী রাণীর গর্ভে জন্ম নেওয়া ছেলে সুধীর বর্মনের আশ্রয়েই কেটেছে তাঁর জীবনের বাকিটা সময়। কিন্তু সমাজ এতটাই নিষ্ঠুর যে, বড় হয়েও সুধীরকে প্রতিনিয়ত ‘পাঞ্জাবির বাচ্চা’ বলে কটূক্তি ও অপমানের মুখোমুখি হতে হয়েছে। একবার সুধীরকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কেন তিনি এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন না? সুধীর অত্যন্ত শান্ত ও বেদনার্ত কণ্ঠে উত্তর দিয়েছিলেন— “ঝগড়া করতে তো লোক লাগে, কিন্তু আমার কে আছে?” হ্যাঁ, সুধীরের পাশে সেদিনও কেউ ছিল না, আজও তথাকথিত সমাজ নেই। কিন্তু এই একা লড়াইয়ের মাঝেও সুধীর মাথা উঁচু করে বেঁচে আছেন। তাঁর একটি কন্যা সন্তান রয়েছে, যার নাম তিনি রেখেছেন অত্যন্ত সার্থকভাবে— ‘জনতা’। আজকের প্রজন্মের প্রতিনিধি ‘জনতা’ তার দাদীকে নিয়ে গর্ব করে। তাকে যখন তার দাদীর আত্মত্যাগ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তখন সে কোনো দ্বিধা না রেখে দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিল— “দেশে যদি আবার যুদ্ধ হয়, দাদীর মতো আমিও দেশের জন্য নিজের সব কিছু বিসর্জন দিতে দ্বিতীয়বার ভাববো না।” এই হলো আমাদের ‘জনতা’— একাত্তরের প্রকৃত উত্তরসূরি, যারা দাদীর ত্যাগকে গ্লানি নয়, বরং দেশের সবচেয়ে বড় গৌরব মনে করে। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও শেষ ইচ্ছা পূরণ : দীর্ঘ অবহেলা আর অন্ধকারের পর, ২০১৭ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে টেপরী রাণীকে ‘বীরাঙ্গনা’ (যা প্রকৃতপক্ষে পূর্ণাঙ্গ ‘মুক্তিযোদ্ধা’) স্বীকৃতি প্রদান করে। সে সময় বৃদ্ধ বয়সে এসে তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, জীবনের শেষ প্রান্তে তাঁর আর কোনো চাওয়া আছে কি না। টেপরী রাণী অত্যন্ত আকুল হয়ে বলেছিলেন: “মৃত্যুর পর তাঁর দেহটাকে যেন লাল-সবুজের পতাকায় মুড়িয়ে জাতি বিদায় জানায়। এর চেয়ে বেশি কিছু তাঁর আর চাওয়ার নেই।”মৃত্যুর পর এই বীর মায়ের সেই শেষ ইচ্ছা পূর্ণ হয়েছে। রাষ্ট্রীয় পূর্ণ মর্যাদায়, লাল-সবুজের জাতীয় পতাকায় মুড়িয়ে তাঁকে চিরবিদায় জানানো হয়েছে। ঢাকা-সিডনি ইনসাইডারের পক্ষ থেকে আমরা এই মহান মায়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। আসুন, আমরা অন্তর থেকে তাঁকে স্যালুট জানাই এবং তার স্মরণে একাগ্রচিত্তে এক মিনিট নীরবতা পালন করি। কোটি কোটি মানুষের এই নীরবতাই হোক টেপরী রাণী, সুধীর এবং জনতার প্রতি আমাদের প্রকৃত ঋণস্বীকার। রাজাকারের বংশধর ও দোসররা জেনে রাখুক, ঘৃণ্য বিশ্বাসঘাতকতার কারণেই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এতটা দীর্ঘ, রক্তক্ষয়ী এবং যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠেছিল। পরিশেষে স্পষ্ট কথা— এই স্বাধীন মানচিত্র ও প্রিয় বাংলাদেশের ওপর তোদের চেয়ে বীর মাতা টেপরী রাণী, তার পুত্র সুধীর এবং নাতনী জনতার অধিকার ও হক শতগুণ বেশি। Post navigation জিয়াউর রহমানের ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তারেক রহমানের শ্রদ্ধা নিবেদন ক্যাম্পবেলটাউনে মঞ্চস্থ হলো তিন প্রজন্মের অভিবাসী জীবনের গল্প ‘টেন ইয়ার্স টু হোম’