Screenshot

চুকনগর গণহত্যা কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি বাঙালির আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতার জন্য চড়া মূল্য দেওয়ার এক জীবন্ত দলিল। ভদ্রা নদীর শান্ত জল আজো যেন বয়ে চলেছে ১০ হাজারেরও বেশি নাম না জানা শহীদের রক্তের নীরব মহাকাব্য।

২০ মে। ১৯৭১ সালের এই দিনে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার ৫ নম্বর আটলিয়া ইউনিয়নের চুকনগর গ্রামে রচিত হয়েছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম বর্বরোচিত ও নৃশংসতম কালো অধ্যায়। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একদিনে সংগঠিত সর্ববৃহৎ গণহত্যা এটি। সেদিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের বুলেটের আঘাতে চুকনগরের মাটিতে পঙ্গপালের মতো ঝরে পড়েছিল ১০ হাজারেরও বেশি নিরীহ মানুষের তাজা প্রাণ। চুকনগর গণহত্যা কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি বাঙালির আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতার জন্য চড়া মূল্য দেওয়ার এক জীবন্ত দলিল। ভদ্রা নদীর শান্ত জল আজো যেন বয়ে চলেছে ১০ হাজারেরও বেশি নাম না জানা শহীদের রক্তের নীরব মহাকাব্য।

১৯৭১ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর ও গোপালগঞ্জসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলা থেকে লাখ লাখ মানুষ প্রাণভয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল। চুকনগর ছিল সীমান্ত অতিক্রম করার আগের ট্রানজিট পয়েন্ট। তিন দিক নদীবেষ্টিত এবং নিরাপদ ভেবে ভারতের দিকে ছুটতে থাকা হাজার হাজার হিন্দু ও মুসলিম শরণার্থী এসে আশ্রয় নিয়েছিল এই চুকনগর বাজারে, স্থানীয় পাতখোলা বিল ও ভদ্রা নদীর তীরে। কিন্তু তারা জানত না, তাদের এই শেষ আশ্রয়স্থলই কিছুক্ষণের মধ্যে এক নির্মম মৃত্যুফাঁদে পরিণত হতে যাচ্ছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার তাণ্ডব এবং ১০ হাজার লাশ

২০ মে সকাল আনুমানিক সাড়ে ১০টা। একটি ট্রাকে করে হুট করেই চুকনগর বাজারের দিকে ধেয়ে আসে একদল পাকিস্তানি সেনা। হালকা ও ভারী অস্ত্র হাতে গাড়ি থেকে নেমেই কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা নির্বিচারে ব্রাশফায়ার শুরু করে। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে মানুষ যখন বাঁচার জন্য ভদ্রা নদীতে ঝাঁপ দিচ্ছিল, ঘাতকরা তখনো শান্ত হয়নি। জল-স্থল সবখানে শুধু বুলেটের গর্জন আর মানুষের আর্তনাদ। চুকনগর বাজার, খেয়াঘাট, ধানের ক্ষেত থেকে শুরু করে ভদ্রা নদীর পানি মুহূর্তের মধ্যে মানুষের রক্তে লাল হয়ে ওঠে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার এই পৈশাচিক তাণ্ডবে চুকনগরের চত্বর রূপ নেয় লাশের স্তূপে। সেদিন মায়ের কোল থেকে ছিটকে পড়া শিশুর কান্না, স্বামীর মরদেহের ওপর স্ত্রীর বুকফাটা আর্তনাদ আর পুরো চুকনগর জুড়ে লাশের গন্ধ এক নরককুণ্ড তৈরি করেছিল।” —

রক্তে রাঙা ভদ্রা নদী :সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, চারদিকে এত বেশি লাশ পড়েছিল যে স্থানীয় মানুষ বাধ্য হয়ে মৃতদেহগুলো টেনে ভদ্রা নদীতে ফেলে দিতে শুরু করে। হাজার হাজার লাশের ভারে একপর্যায়ে শান্ত ভদ্রা নদীর স্রোত থমকে গিয়েছিল। নদীর পানি আর পানি ছিল না, তা রূপ নিয়েছিল রক্তের এক বিশাল স্রোতস্বিনীতে। মাসের পর মাস ধরে সেই নদীতে ভেসেছিল মানুষের কঙ্কাল আর গলিত লাশ।

চুকনগর আজো কাঁদে :আজ এতগুলো বছর পার হয়ে গেলেও চুকনগরের বাতাস থেকে সেদিনের সেই কান্নার রোল যেন মুছে যায়নি। প্রতি বছর ২০ মে এলে চুকনগর শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে মানুষের ঢল নামে, ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয় সেই বীর শহীদদের প্রতি। চুকনগর গণহত্যা কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি বাঙালির আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতার জন্য চড়া মূল্য দেওয়ার এক জীবন্ত দলিল। ভদ্রা নদীর শান্ত জল আজো যেন বয়ে চলেছে ১০ হাজারেরও বেশি নাম না জানা শহীদের রক্তের নীরব মহাকাব্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *