মাঠের লড়াই শুরুর আগেই দুই দেশের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ও ফুটবল বৈরিতার কারণে পুরো আটলান্টা শহরজুড়ে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করেছে স্থানীয় পুলিশ বিভাগ।
ইনসাইডার ডেস্ক: দীর্ঘ ২৪ বছর পর ফুটবল বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মেগা মঞ্চে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি—আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। বুধবার (১৫ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার ঐতিহ্যবাহী মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে এই হাইভোল্টেজ ম্যাচ। তবে মাঠের লড়াই শুরুর আগেই দুই দেশের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ও ফুটবল বৈরিতার কারণে পুরো আটলান্টা শহরজুড়ে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করেছে স্থানীয় পুলিশ বিভাগ।
বারুদ ঠাসা ইতিহাস ও ফকল্যান্ডের ক্ষত
আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের ম্যাচ মানেই কেবল ফুটবল নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ইতিহাস, রাজনীতি আর আবেগের চরম বিস্ফোরণ। ১৯৮২ সালের রক্তক্ষয়ী ‘ফকল্যান্ড যুদ্ধ’ (আর্জেন্টাইনদের কাছে যা মালভিনাস নামে পরিচিত) দুই দেশের সম্পর্কে যে সংবেদনশীল ক্ষত তৈরি করেছিল, তা ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই ঐতিহাসিক ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ‘শতাব্দীর সেরা গোল’-এর মাধ্যমে ফুটবল মাঠে রূপ নেয় এক চিরস্থায়ী দ্বন্দ্বে।
টিকিট নীতি ও দাঙ্গা আতঙ্ক
৭৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামের এই ম্যাচটিকে ঘিরে আটলান্টা পুলিশ ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ফিফার টিকিট বণ্টন নীতি। সাধারণ ক্যাটাগরির টিকিটের কারণে দুই দেশের হাজার হাজার সমর্থক গ্যালারিতে একে অপরের পাশাপাশি বসার সুযোগ পাচ্ছেন। দুই দেশের চিরবৈরী সমর্থকদের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট পৃথকীকরণ না থাকায় এবং গ্যালারিতে ৫০-৫০ উপস্থিতির সম্ভাবনায় যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দাঙ্গা বা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা জোরদার: পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুরো আটলান্টা শহর ও স্টেডিয়াম এলাকা অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে এক কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনীতে মুড়ে ফেলা হয়েছে।
মাঠের বাইরের বিতর্ক ও আর্জেন্টিনা ক্যাম্পের অবস্থান
কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে হারানোর পর ড্রেসিংরুমে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের ফকল্যান্ড যুদ্ধ নিয়ে গান গাওয়ার একটি ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তবে সেমিফাইনালের আগে আর্জেন্টিনা ক্যাম্প এখন কেবল ফুটবলেই মনোযোগ দিতে চায়।
ম্যাচের আগের সংবাদ সম্মেলনে মাঠের বাইরের হাইপ ও রাজনৈতিক বিতর্ক উসকে দিতে সাফ মানা করে দিয়েছেন আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি। তিনি শান্ত ভাষায় বলেন:
“আমার বার্তা খুবই পরিষ্কার—এটি স্রেফ একটি ফুটবল ম্যাচ, এর বেশি কিছু নয়। আমরা চমৎকার একজন কোচের অধীনে থাকা ভীষণ কঠিন এক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি। তবে দিনশেষে এটি একটি ফুটবল ম্যাচ এবং আমাদের ভাবনায় কেবল সেটুকুই থাকবে।”
একই সুর শোনা গেছে আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার রদ্রিগো ডি পলের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, “এই ম্যাচটি ডিয়েগোর ৮৬-র সেই কীর্তি এবং আমাদের গানগুলোর জন্য ফকল্যান্ড যুদ্ধের বীরদের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। তবে আমাদের বুঝতে হবে, ফকল্যান্ড বা মালভিনাস নিয়ে আলোচনা করার ক্ষেত্র এগুলো নয়; মাঠে আমাদের মূল মনোযোগ কেবল ফুটবলেই রাখা উচিত।”
যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হলেও এর আঁচ এসে লেগেছে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ায়। ঐতিহাসিক এই মহারণকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও সিডনির ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে তুমুল উত্তেজনা বিরাজ করছে। সিডনির লাকেম্বা ও রকডেলের মতো প্রবাসী বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলোর ক্যাফে ও রেস্তোরাঁগুলোতে ম্যাচটি বড় পর্দায় দেখানোর বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। অন্যদিকে, ঢাকার চিরচেনা ফুটবল উন্মাদনা তো রয়েছেই; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ও বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় জায়ান্ট স্ক্রিনে খেলা দেখার প্রস্তুতি নিচ্ছেন আলবিসেলেস্তে সমর্থকরা। সিডনি ও ঢাকার প্রবাসী ফুটবল অনুরাগীদের মতে, এই ম্যাচটি কেবল সেমিফাইনাল নয়, এটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক ক্ল্যাসিক লড়াই।



