মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব দেশে জ্বালানি তেল সরবরাহে টানা দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চাপ সৃষ্টি করেছে। ঈদের ছুটি শেষে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে; ভোগান্তিও চরমে পৌঁছেছে। সোমবার (২৩ মার্চ) ঈদের তৃতীয় দিন সকাল গড়াতে না গড়াতেই রাজধানীর সড়কগুলোয় মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাসের ভিড় বাড়তে শুরু করে। পরিবহনগুলো একই লাইনে দাঁড়িয়ে আছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

রাজধানীর মিরপুর, বিজয় সরণি, শাহবাগ, মহাখালী, বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন হয় বন্ধ, নয়তো সীমিত আকারে জ্বালানি সরবরাহ করছে।  কোথাও ‘তেল নেই’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলছে; কোথাও আবার খোলা পাম্পের সামনে কয়েকশ গাড়ির লাইন। যদিও সরকারের জ্বালানিমন্ত্রী বলছেন, দেশে তেলের কোনো সংকট নেই, সরবরাহ অব্যাহত আছে। তবে ঈদের কারণে গত দুই দিন সরবরাহ বন্ধ থাকায় কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে।

সোমবার বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের সামনে গিয়ে দেখা যায়, তেল বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ। অথচ গাড়ির সারি জাহাঙ্গীর গেট ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত গড়িয়েছে। মোটরসাইকেলের লাইন গিয়ে ঠেকেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গেটের কাছে। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা আনিসুল ইসলাম জানান, তিনি সকাল থেকে অপেক্ষা করছেন।

বলা হয়েছে দুপুরের পর তেল দেওয়া হতে পারে; তবে কিছুই নিশ্চিত নয়।

মিরপুর-১৪ নম্বরের দিগন্ত ফিলিং স্টেশন ও শেওড়াপাড়ার সোবহান ফিলিং স্টেশন ঈদের দিন থেকেই বন্ধ। কর্মচারীরা জানিয়েছেন, প্রতিদিন যেখানে ৪০ হাজার লিটার তেলের চাহিদা থাকে, সেখানে অর্ধেক সরবরাহ পেয়েই কোনোভাবে ঈদের আগ পর্যন্ত চলেছে। ছুটিতে নতুন তেল না আসায় এখন সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। অন্যদিকে, শাহবাগের একটি পাম্পে সকাল থেকেই তেল বিক্রি চলছে। তবে সেখানেও লাইন গিয়ে পৌঁছেছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) হাসপাতালের গেট পর্যন্ত। কর্তৃপক্ষ বলছে, মজুত থাকায় আপাতত সরবরাহ দেওয়া যাচ্ছে, কিন্তু এই চাপ কতক্ষণ সামাল দেওয়া যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

আগারগাঁওয়ের তালতলার একটি পাম্পে গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে। তবে অভিযোগ আছে, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারে তেল সরবরাহের ওপর প্রভাব খাটাচ্ছেন। বাংলানিউজের সাংবাদিক মো. জুবাইর ওই পাম্পে নিজের মোটরসাইকেলের জ্বালানি নিতে গিয়ে এ পরিস্থিতি লক্ষ্য করেন। পাম্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে তিনি পরিস্থিতি জানার চেষ্টা করেন। কর্মচারীরা বিষয়টি স্বীকার করলেও নিরাপত্তার খাতিরে আর কোনো তথ্য দিতে চাননি। অবশ্য তারা এও বলেছেন, ঈদের ছুটিতে নতুন করে তেল সংগ্রহ করতে না পারায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। তাদের কাছে যতক্ষণ সরবরাহ আসবে, গ্রাহকদের তারা প্রয়োজন অনুযায়ী তেল সরবরাহ করবেন।

অকটেন-পেট্রোল সরবরাহ বন্ধ রয়েছে মিরপুর-১ নম্বরের ফিলিং স্টেশনে। মাটিকাটা এলাকার স্টেশনটিও ঈদের পর দিন থেকে জ্বালানি সরবরাহ করছে না।

এদিকে, বাড্ডা এলাকায় দেখা গেছে ভিন্ন এক চিত্র। কিছু পাম্প সম্পূর্ণ বন্ধ, আর যেগুলো খোলা সেগুলোর সামনে মোটরসাইকেলের লাইন কয়েকশ মিটার ছাড়িয়ে গেছে। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা এক চালক জানান, দেড় ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করেও এখনও অনেক পেছনে আছেন। আরেকজন বলেন, প্রতিদিন এমন পরিস্থিতিতে কাজ ফেলে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।

সংকট শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ নয়। চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহীসহ বিভিন্ন অঞ্চলেও একই অবস্থা। কুড়িগ্রামে সব পাম্প বন্ধ থাকার খবর পাওয়া গেছে। গাইবান্ধায় ১৭টি পাম্পই কার্যত অচল। কোথাও তেল না পেয়ে ক্ষুব্ধ জনতা হামলা চালিয়েছে, আহত হয়েছেন কর্মচারীরাও। এই পরিস্থিতির মূল কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদের দীর্ঘ ছুটি। ব্যাংক বন্ধ থাকায় পাম্প মালিকরা পে-অর্ডার করতে পারছেন না, ফলে ডিপো থেকে নতুন করে তেল উত্তোলন বন্ধ হয়ে গেছে। পাম্প মালিকদের সংগঠনের নেতারা জানিয়েছেন, পে-অর্ডার ছাড়া তেল তোলা সম্ভব নয়, আর নগদ অর্থ নিয়ে ডিপোয় যাওয়া নিরাপত্তার দিক থেকেও ঝুঁকিপূর্ণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি চাপ; চাহিদার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। অনেকে আতঙ্কে অতিরিক্ত তেল মজুদ করছেন, আবার অভিযোগ রয়েছে কিছু মোটরসাইকেল চালক একাধিক পাম্প থেকে তেল সংগ্রহ করে খোলা বাজারে বেশি দামে বিক্রি করছেন। ফলে সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।