ফুটবলকে বলা হয় অনিশ্চয়তার খেলা। আর সেই অনিশ্চয়তাই আবারও নতুন করে প্রমাণ করল আর্জেন্টিনা। শেষ বাঁশি বাজার কয়েক মিনিট আগেও যে দলটি বিদায়ের শঙ্কায় ছিল, তারাই শেষ পর্যন্ত লিখল এক অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প। নাটকীয় সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। সেই সাথে লেখা হয়ে গেল আরেকটি রূপকথার ম্যাচ!
ম্যাচের শুরু থেকেই ছিল উত্তেজনার পারদ। দুই দলের সমর্থকদের গর্জনে মুখর ছিল পুরো স্টেডিয়াম। একদিকে তরুণ ও গতিময় ইংল্যান্ড, অন্যদিকে অভিজ্ঞতা, সাহস আর লিওনেল মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে কেউই এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে রাজি ছিল না।
প্রথমার্ধে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে জমে ওঠে ম্যাচ। ইংল্যান্ড দ্রুতগতির ফুটবল খেলে আর্জেন্টিনার রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করে। সেই চাপ থেকেই তারা এগিয়ে যায়। গোল হজম করার পর কিছুটা চাপে পড়ে যায় আর্জেন্টিনা। ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলতে থাকে, আর তাদের সমর্থকেরা তখন ফাইনালের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন।
কিন্তু যারা লিওনেল মেসিকে চেনেন, তারা জানেন—শেষ বাঁশি বাজার আগে তার দলকে কখনোই শেষ বলে ধরে নেওয়া যায় না।
দ্বিতীয়ার্ধে যেন বদলে যায় পুরো ম্যাচের চিত্র। মাঝমাঠে একের পর এক নিখুঁত পাস, অসাধারণ বল নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রমণ তৈরির মাধ্যমে আর্জেন্টিনাকে সামনে এগিয়ে নিতে থাকেন মেসি। তার প্রতিটি স্পর্শে নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় আলবিসেলেস্তেরা। ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগ ধীরে ধীরে চাপে পড়তে শুরু করে।
সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। স্কোরবোর্ড তখনও ইংল্যান্ডের পক্ষে। আর্জেন্টিনার সমর্থকদের চোখেমুখে উদ্বেগ, আর ইংল্যান্ডের সমর্থকদের মুখে বিজয়ের হাসি।
এরপর আসে ম্যাচের ৮৫তম মিনিট।
বক্সের বাইরে থেকে সুযোগ পেয়ে জোরালো শট নেন এনজো ফার্নান্দেজ। বল সোজা জালে। মুহূর্তেই গর্জে ওঠে পুরো স্টেডিয়াম। ১-১ সমতা ফিরিয়ে আর্জেন্টিনা যেন নতুন জীবন পায়।
গোলের পর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে মেসির দল। তারা বুঝিয়ে দেয়, টাইব্রেকারের অপেক্ষায় নয়—জয় নিয়েই মাঠ ছাড়তে চায়।
যোগ করা সময়ে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।
মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ শুরু করেন মেসি। তার অসাধারণ দূরদৃষ্টি ও নিখুঁত পাসে তৈরি হয় গোলের সুযোগ। বল পৌঁছে যায় লাউতারো মার্তিনেজের কাছে। ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডারদের ফাঁকি দিয়ে ঠান্ডা মাথায় জালে বল জড়িয়ে দেন তিনি।
গোল!
মুহূর্তেই বিস্ফোরিত হয় আর্জেন্টাইন শিবির। সতীর্থদের সঙ্গে উল্লাসে মেতে ওঠেন লাউতারো। মেসির মুখে তখন স্বস্তির হাসি। আর ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা হতাশায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকেন।
কয়েক মুহূর্ত পরই বাজে শেষ বাঁশি।
ইংল্যান্ডের স্বপ্ন থেমে যায় সেমিফাইনালেই। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা উদযাপন শুরু করে আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার আনন্দ। মেসিকে ঘিরে সতীর্থদের উল্লাস যেন জানিয়ে দেয়—স্বপ্ন এখনও বেঁচে আছে।
যদিও গোলের খাতায় নাম লেখাতে পারেননি লিওনেল মেসি, তবে পুরো ম্যাচে তার নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতা এবং আক্রমণ গড়ে তোলার দক্ষতা ছিল আর্জেন্টিনার জয়ের অন্যতম বড় শক্তি। কঠিন মুহূর্তে দলকে শান্ত রাখা এবং শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা আবারও প্রমাণ করেছে কেন তিনি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা।
এই জয়ের মাধ্যমে বিশ্বকাপ ফাইনালে উঠল আর্জেন্টিনা। এখন তাদের সামনে শেষ বাধা স্পেন, যারা অন্য সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করেছে। ফলে বিশ্ব ফুটবল অপেক্ষা করছে আরেকটি মহারণের—স্পেন বনাম আর্জেন্টিনা।
এখন প্রশ্ন একটাই—লিওনেল মেসির হাতেই কি উঠবে আরেকটি বিশ্বকাপ? নাকি শেষ হাসি হাসবে স্পেন? সেই উত্তর মিলবে ফাইনালের মহারণে। তবে সেমিফাইনালের এই অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন বহুদিন ধরে বিশ্বকাপের স্মরণীয় ম্যাচগুলোর একটি হয়ে থাকবে।



