পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত যে সিডনিসহ বেশ কিছু এলাকায় জারি করা হয়েছে পূর্ণাঙ্গ অগ্নি প্রজ্জ্বলন নিষেধাজ্ঞা
সিডনিতে বসন্তের শুরুতেই যেন নেমে এলো গ্রীষ্মের দাবদাহ। শনিবার ৩২.১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে সেপ্টেম্বরের শুরুতেই এই সময়কার সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙেছে অস্ট্রেলিয়ার এই শহর। তীব্র গরমের সঙ্গে শুষ্ক ঝোড়ো বাতাসে বেড়ে যায় দাবানলের আশঙ্কা। ফলে জারি হয় চরম অগ্নিঝুঁকির সতর্কতা। বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে কিছু এলাকায় আগুণ জ্বালানোর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
১৮৫৯ সালে তাপমাত্রা রেকর্ড রাখা শুরুর পর সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সিডনির তাপমাত্রা কখনো ৩২ ডিগ্রি ছাড়ায়নি। শনিবার দুপুর ২টা ৩৩ মিনিটে সিডনির অবজারভেটরি হিলে তাপমাত্রা ওঠে ৩২.১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এটাই এ মৌসুমে এত তাড়াতাড়ি ৩২ ডিগ্রি পার করার প্রথম ঘটনা। এর আগে বসন্তের এত শুরুর দিকে ৩২ ডিগ্রি ছোঁয়ার রেকর্ড ছিল ১৩ সেপ্টেম্বর—২০০৯ ও ২০১৭ সালে।
শহরের প্রায় সব এলাকাতেই তাপমাত্রা উঠে যায় ৩০ থেকে ৩৩ ডিগ্রির মধ্যে। পশ্চিম সিডনির পেনরিথে তাপমাত্রা ৩৩ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যায়। শুষ্ক ও দমকা পশ্চিমা বাতাস ভেতরের উষ্ণ বায়ু শহরের ওপর ঠেলে আনায় উপকূলীয় এলাকাতেও অস্বাভাবিক গরম অনুভূত হয়।
চার দিনের উষ্ণতাতেও রেকর্ড
শনিবারের রেকর্ড তাপমাত্রা ছিল অস্বাভাবিক উষ্ণ একটি চার দিনের ধারাবাহিকতার চূড়ান্ত প্রকাশ। এই চার দিনে অবজারভেটরি হিলে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার গড় ছিল ২৭.৯৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস—সেপ্টেম্বরের শুরুর দীর্ঘমেয়াদি গড়ের চেয়ে প্রায় ৮ ডিগ্রি বেশি।
এই গড়ও সেপ্টেম্বরের এত শুরুর দিকে সিডনির উষ্ণতম চার দিনের নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে। চলতি বসন্তের প্রথম কয়েক দিনেই শহরটির তাপমাত্রা গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়ের স্বাভাবিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রার কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
গরমের সঙ্গে দাবানলের ভয়
তীব্র তাপের সঙ্গে পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে শুষ্ক ও প্রবল বাতাস। সিডনির বিভিন্ন এলাকায় বাতাসের আর্দ্রতা নেমে আসে প্রায় ২০ শতাংশে। ফলে শুকনো ঘাস ও বনাঞ্চলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
গ্রেটার সিডনিতে শনিবার ‘এক্সট্রিম’ বা চরম অগ্নিঝুঁকি ঘোষণা করা হয়। এ কারণে জারি করা হয় টোটাল ফায়ার ব্যান—মধ্যরাত পর্যন্ত যা বহাল ছিল। অগ্নিকাণ্ডের আশঙ্কায় বাসিন্দাদের আগুন জ্বালানোর বিষয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে বলা হয়।
ব্যুরো অব মেটিওরোলজির জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ জোনাথন হাও বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব অস্ট্রেলিয়াজুড়ে একটি শক্তিশালী আবহাওয়া ব্যবস্থা একই সঙ্গে গরম, ঝোড়ো বাতাস, বৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি তৈরি করেছে। সিডনিতে অগ্নিঝুঁকি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
কয়েক ঘণ্টাতেই বদলে গেল আবহাওয়া
তবে শনিবার বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আবহাওয়ার চিত্র দ্রুত পাল্টাতে শুরু করে। একটি শক্তিশালী শীতল ফ্রন্ট দক্ষিণ-পূর্ব অস্ট্রেলিয়ার ওপর দিয়ে অগ্রসর হয়ে সিডনির দিকে এগিয়ে আসে। উষ্ণ পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিমা বাতাসের জায়গা নিতে শুরু করে তুলনামূলক ঠান্ডা পশ্চিম-দক্ষিণ-পশ্চিমা বাতাস।
আবহাওয়াবিদ হাওয়ের ভাষায়, গরম আবহাওয়া বেশি সময় স্থায়ী হবে না। শীতল পরিবর্তন উপকূল ধরে উত্তরের দিকে অগ্রসর হবে এবং সিডনিতে তাপমাত্রা দ্রুত কমতে শুরু করবে।
শনিবার রাত ১০টা ৩০ মিনিটে অবজারভেটরি হিলের তাপমাত্রা নেমে আসে ২০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। অর্থাৎ দুপুরের রেকর্ড ৩২.১ ডিগ্রি থেকে রাতের মধ্যে তাপমাত্রা প্রায় ১২ ডিগ্রি কমে যায়।
ঘণ্টায় ১১৩ কিলোমিটার বাতাস
তাপমাত্রা কমলেও ঝোড়ো বাতাসের বিপদ পুরোপুরি কাটেনি। নিউ সাউথ ওয়েলসের বিভিন্ন এলাকায় শনিবার ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটারের বেশি গতির দমকা বাতাস রেকর্ড হয়েছে।
পেনরিথ লেকসে সর্বোচ্চ ১১৩ কিলোমিটার, মোস ভ্যালে ১০৪, ক্যাব্রামুরায় ১০৪ এবং সিডনি বিমানবন্দরে ৯৬ কিলোমিটার গতির বাতাস রেকর্ড করা হয়।
সিডনি ও ইল্লাওয়ারার জন্য সন্ধ্যার মধ্যে তীব্র আবহাওয়ার সতর্কতা বাতিল করা হলেও স্নোই মাউন্টেনস, দক্ষিণ এয়ারনেটি, সাউথ কোস্ট, সেন্ট্রাল টেবিলল্যান্ডস, হান্টার এবং মিড নর্থ কোস্টের কিছু এলাকায় ক্ষতিকর মাত্রার বাতাসের আশঙ্কা অব্যাহত ছিল।
বৃষ্টি, বজ্রঝড় ও বন্যার আশঙ্কা
শক্তিশালী শীতল ফ্রন্টটির প্রভাব শুধু নিউ সাউথ ওয়েলসেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ভিক্টোরিয়া, তাসমানিয়া ও সাউথ অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি ও বজ্রঝড় হয়েছে। উত্তর ভিক্টোরিয়া ও তাসমানিয়ায় বন্যার আশঙ্কায় সতর্কতা জারি করা হয়।
অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের পার্বত্য এলাকাগুলোতে তুষারপাত ও তুষারঝড়ের সম্ভাবনাও তৈরি হয়। একই সময়ে এক অঞ্চলে যখন তীব্র গরম ও দাবানলের আশঙ্কা, অন্য অঞ্চলে তখন ঠান্ডা আবহাওয়া ও তুষারের পূর্বাভাস—অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়ায় তৈরি হয় এক নাটকীয় বৈপরীত্য।
উত্তরে গরম থাকবে
শীতল বায়ু রোববার আরও উত্তরের দিকে অগ্রসর হয়। ফলে সিডনিতে আবহাওয়া অনেকটাই মৃদু হতে শুরু করে। তবে নিউ সাউথ ওয়েলসের আরও উত্তরের অংশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব কুইন্সল্যান্ডে কিছু সময় উষ্ণতা অব্যাহত থাকবে।
শনিবার সিডনির জন্য যে দিনটি শুরু হয়েছিল ১৬৭ বছরের রেকর্ড গরম দিয়ে, সেটিই শেষ হয়েছে তীব্র শীতল পরিবর্তন ও ঝোড়ো বাতাসের মধ্যে। বসন্তের শুরুতেই আবহাওয়ার এমন নাটকীয় পালাবদল ফের সামনে এনেছে অস্ট্রেলিয়ার ক্রমবর্ধমান চরম আবহাওয়ার ঝুঁকিকে।



