ডারউইনে তিন দিন ধরে যে একটু একটু করে যে ভিত গড়া হয়েছে, সেটিই গর্বের সৌধ হয়ে উঠল চতুর্থ দিনের দ্বিতীয় সেশনে। অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ। স্রেফ জয় বললেও আসলে কিছুই বলা হয় না। টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দলকে তাদের আঙিনায় সাড়ে তিন দিন ধরে ভুগিয়ে, তাদের ওপর ছড়ি ঘুরিয়ে স্রেফ বিধ্বস্ত করে ছাড়ল র্যাঙ্কিংয়ের ৯ নম্বর দল। বাংলাদেশের দাপট স্পষ্ট হয় একটি তথ্যে, গোটা ম্যাচের ১১ সেশনের একটিতেও এগিয়ে ছিল না অস্ট্রেলিয়া।
প্রথম দিনে অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দিয়ে জয়ের বীজ বুনে দিয়েছিলেন বোলাররা। সেখান থেকে ব্যাটসম্যানদের নৈপুণ্যে বিশাল লিড নিয়ে উঁকি দেয় বিশ্বাসের চারা। এরপর তা বেড়ে উঠতে থাকে এবং ডালপালা ছড়ায়। দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া থামে ২৮৪ রানে। ৫৭ রানের জয়ের লক্ষ্য ছুঁতে বেগ পেতে হয়নি একদমই।
ব্যাট হাতে ৬৫ রানের ইনিংসের পর অসাধারণ বোলিংয়ে ৫ উইকেট নিয়ে দলকে জয়ের পথে এগিয়ে নেন মেহেদী হাসান মিরাজ। তবে প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটিং গুঁড়িয়ে দিয়ে ম্যান অব দা ম্যাচ হাসান মাহমুদ। তার ১১১ রানে ৯ উইকেট দেশের বাইরে বাংলাদেশের সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড। অস্ট্রেলিয়াতে এখনও কোনো জয়ের মুখ দেখেনি শ্রীলঙ্কা। পাকিস্তান সবশেষে জিতেছে ১৯৯৫ সালে এবং এরপর থেকে টানা ১৭ টেস্ট হেরেছে। বাংলাদেশ করে ফেলেছে অভাবনীয় কিছুই।
৪ উইকেটে ১৬১ রান নিয়ে দিন শুরু করে অস্ট্রেলিয়া। আগের দিন জমে যাওয়া গ্রিন ও অ্যালেক্স কেয়ারির জুটি এ দিন আর বেশি দীর্ঘায়িত হয়নি। স্পিনে দক্ষ কেয়ারিকে দারুণ এক ডেলিভারিতে ফেরান মিরাজ। একটু পর আরও দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে তিনি বোল্ড করে দেন বাউ ওয়েবস্টারকে। বিভ্রান্ত ব্যাটসম্যান আউট হয়ে হতভম্ব হয়ে যান পুরোপুরি। জয়ের সুবাস তখনই ছড়িয়ে পড়তে থাকে বাতাসে। মিরাজ ফিরিয়ে দেন অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক প্যাট কামিন্সকেও।
গত অ্যাশেজে বোলিংয়ের পাশাপাশি ব্যাট হাতেও ইংল্যান্ডকে ভোগানো মিচেল স্টার্ক এরপর জুটি গড়ার চেষ্টা করেন গ্রিনের সঙ্গে। কিছুটা লড়াই করে লাঞ্চে যায় অস্ট্রেলিয়া। তবে বাংলাদেশও ফিরে আসে প্রবলভাবে। দ্বিতীয় নতুন বলে স্টার্ককে ফিরিয়ে ৪৩ রানের জুটি ভাঙেন তাসকিন আহমেদ। এক প্রান্তে লড়াই করে গ্রিন পৌঁছে যান সেঞ্চুরিতে। দলে জায়গা টিকিয়ে রাখার চেষ্টায় থাকা অলরাউন্ডারের ক্যারিয়ার নতুন গতি পাবে এই শতরানে। স্রেফ চারটি চার ও একটি ছক্কা ছিল তার ইনিংসে, তার মনোসংযোগ ও লড়াইয়ের চিত্র ফুটে ওঠে এতেই।
তবে এরপর আর বেশিক্ষণ এগোতে পারেননি তিনিও। হাসানের নিচু হওয়া এক ডেলিভারি তার ব্যাটের নিচের অংশে লেগে ছোবল দেয় স্টাম্পে। ন্যাথান লায়নকে ফিরিয়ে পাঁচ উইকেট পূর্ণ করার পাশাপাশি ইনিংসও শেষ করে দেন মিরাজ। তার বোলিং পারফরম্যান্স কতটা অসাধারণ, তা বোঝা যাবে একটি তথ্যে। মুত্তাইয়াহ মুরালিদারান, হারভাজান সিং, রাভিচান্দ্রান অশ্বিন, ইয়াসির শাহ, রাভিন্দ্রা জাদেজার মতো গ্রেটরা কখনও অস্ট্রেলিয়াতে পাঁচ উইকেটের স্বাদ পাননি!
ছোট্ট রান তাড়ায় শূন্য রানে ফেরেন প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান তানজিদ হাসান। ব্যস, হোঁচট বলতে ওই সামান্যটুকুই। সাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক পরের পথটুকু পাড়ি দেন অনায়াসেই। ৪২ বলে ২৫ রানে অপরাজিত থাকেন সাদমান, ৩৯ বলে ২৫ রানে মুমিনুল। টেস্ট অধিনায়ক থাকার সময় এই দেশের টেস্ট সংস্কৃতি বদলানোর সূচনা করেছিলেন মুমিনুল, পেস বিপ্লবের শুরুর পরিকল্পনাও ছিল তার। বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্মরণীয়তম জয়টি ধরা দেয় তার বাউন্ডারিতেই। এই জয়ের মাহাত্ম্য ফুটে উঠল পুরস্কার বিতরণী আয়োজনে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর কণ্ঠে, “যে কোনো সংস্করণে বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা জয়।”
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
অস্ট্রেলিয়া ১ম ইনিংস: ১৯৮
বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ৪২৬
অস্ট্রেলিয়া ২য় ইনিংস: ৯৫.১ ওভারে ২৮৪ (আগের দিন ১৬১/৪) (গ্রিন ১০৪, কেয়ারি ৩০, ওয়েবস্টার ৫, কামিন্স ৮, স্টার্ক ১৮, লায়ন ১৫, হেইজেলউড ০*; তাসকিন ১৮-৩-৬৬-১, হাসান ১৯-৩-৫৬-৩, ইবাদত ৮-০-৩৮-০, তাইজুল ১৭-১-৫১-১, মিরাজ ৩৩.১-৬-৬৬-৫)।
বাংলাদেশ ২য় ইনিংস: (লক্ষ্য ৫৭) ১৪.২ ওভারে ৫৭/১ (সাদমান ২৫*, তানজিদ ০, মুমিনুল ৩০*; স্টার্ক ৪-০-১৫-০, হেইজেলউড ৩-১-৫-১, লায়ন ৫-০-২৩-০, ওয়েবস্টার ২.২-০-১২-০)
ফল: বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ী।



