চলতি বছরের শুরুর দিকে হামের প্রাদুর্ভাবের খবর এলেও সরকার ১৫ মার্চ থেকে তথ্য দেওয়া শুরু করেছে। চলতি বছরে এ পর্যন্ত হাম এবং উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। দিনের হিসেবে গড়ে ৫ জনের বেশি মারা যাচ্ছে।
হামের উপসর্গ নিয়ে বুধবার পর্যন্ত হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫৮০। তাদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৯৩ জন। আর চিকিৎসা শেষে ছাড়া পেয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৮১৯ জন। হাম শনাক্ত হয়েছে, এমন রোগীর সংখ্যা ১৯ হাজার ৯০৪। তবে হাপসাতালে আসা সব রোগীর হাম পরীক্ষা করা হয় না।
আর ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি গ্রুপ-নাইট্যাগ গাইড লাইন অনুসারে এখন পরীক্ষার দরকার নাই। কারণ ৬৪ জেলা এবং প্রায় সব উপজেলায় হাম। সে কারণে উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের সবাইকে হাম আক্রান্ত হিসেবে ধরে নিতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, হাম সংক্রমণের প্রথম ৩০ দিনে ২ হাজার ৫শ’ জনের মতো রোগী সারাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি ছিল। পরের তিন মাস ৪ হাজারে সীমাবদ্ধ ছিল এ সংখ্যা।
৩১ জুলাইয়ের হিসেবে বিভিন্ন হাসপাতালে রোগী ভর্তি ছিল ৪ হাজার ১২৮ জন। বুধবার এ সংখ্যা পাওয়া গেছে ৫ হাজার ৫৭৪ জন, যা প্রথম ৩০ দিনের তুলনায় দ্বিগুণ।
হামের প্রাদুর্ভাবের পর সমালোচনা ও বিক্ষোভের মুখে সরকার প্রথমে ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি উপজেলায় হাম-রুবেলার টিকাদান শুরু করে ৫ এপ্রিল।
এরপর চারটি সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকাদান শুরু হয় ১২ এপ্রিল। আর ২০ এপ্রিল শুরু হয়ে ২০ মে শেষ হয় দেশব্যাপী হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি। গেল ১৪ মে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে লক্ষ্যমাত্রার শতভাগ ‘কাভারেজ’ বা শতভাগ শিশুকে টিকাদান সম্পন্ন হওয়ার তথ্য প্রকাশ করা হয়।
হামের প্রকোপ ঠেকাতে টিকাদানের যে লক্ষ্যমাত্রা সরকার ঠিক করেছিল তার সঙ্গে ভিটামিন ‘এ প্লাস’ ক্যাপসুল কর্মসূচির আওতায় আনা শিশুর সংখ্যার ফারাক থাকায় টিকা ‘কাভারেজ’ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
হামের মতো একই বয়সি শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কর্সূচিতে অন্তর্ভুক্ত করে সরকার। অর্থাৎ দুই কর্মসূচিরই আওতায় আনা শিশুর বয়স ৬ থেকে ৫৯ মাস ছিল।
জাতীয় পুষ্টিপ্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুসারে, গেল ২৮ জুন ২ কোটি ২৩ লাখ ৬০ হাজার ৫০৯ জন শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়েছে।
আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনের তথ্য অনুসারে, হামের টিকা পেয়েছে এক কোটি ৮৪ লাখ ৭৭ হাজার ৬১৬ জন শিশু। ক্যাপসুল খাওয়া ও টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে ৩৮ লাখ ৮২ হাজার ৮৯৩ জনের পার্থক্য দেখা গেছে। এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় সরকার বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনার কথা বলেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ বুলেটিন অনুসারে, দেশের ১ কোটি ৮০ লাখ লক্ষমাত্রার বিপরীতে ১ কোটি ৯৭ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। যা লক্ষমাত্রার হিসাবে ১০৯ শতাংশ।
হিসাব করে দেখা যায়, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ও হামের টিকা পাওয়া শিশুর সংখ্যার পার্থক্য এখনো প্রায় ২৬ লাখ। অর্থাৎ ৮৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ শিশু হামের টিকা পায়নি।
গেল ১৯ আগস্ট বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেছেন, হাম নিয়ে অবাস্তব আশ্বাস দেওয়ার সুযোগ নেই। টিকাদানের গতি শতভাগ বাড়ানো হলেও হাম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও দুই থেকে তিন মাস লাগবে।
“তবে এ সময়ে সর্বোচ্চ চিকিৎসা এবং মাঠপর্যায়ে নজরদারি জোরদারের মাধ্যমে শিশুমৃত্যু কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
হামে মারা যাওয়াদের বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তাতে দেখা যায়, মৃতদের ২০ শতাংশের বয়স ছয় মাসের কম; আর ৬ থেকে ৯ মাসের কম বয়সের ৩১ শতাংশ। অর্থাৎ হামে মৃতদের ৫১ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম।
তথ্য বলছে, ছয় মাসের কম এবং পাঁচ বছরের বেশি বয়সি শিশুরা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কিন্তু তাদের টিকার আওতায় আনা বা অন্য কীভাবে সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হবে, সে বিষয়ে সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত জানা যায়নি। এ দুই বয়স শ্রেণির এ শিশুদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত না হলে হাম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
টিকাদানের শুরুতে এপ্রিল মাসে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তর থেকে দাবি করা হয়, টিকাদানের পর জুন মাস থেকে হাম সংক্রমণ কমতে থাকবে। তবে বাস্তবে সংক্রমণ পরিস্থিতি সেটির বিপরীত।
হামের টিকার ক্ষেত্রে শতভাগ ‘কাভারেজ’ দাবি করলেও শিশুদের কাঙ্ক্ষিত বড় অংশের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (হার্ড ইমিউনিটি) তৈরি না হওয়ায় হামের সংক্রমণ কমেনি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে “দেশের বিপুল সংখ্যক শিশু টিকাদানের বাইরে থেকে গেছে। ফলে তাদের শরীরে হার্ড ইউমিনিটি তৈরি হয়নি৷ অন্যদিকে ছয় মাসের কম বয়সি শিশুও হামে আক্রান্ত হচ্ছে৷ তারা কেন আক্রান্ত হচ্ছে? কারণ তাদের মা হামের টিকা পায়নি৷ ফলে শিশুর শরীরেও হামের ইউমিনিটি তৈরি হয়নি৷ এবার হামে মৃত্যুর অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অপুষ্টি। সেক্ষেত্রে শিশুদের মায়ের দুধ খাওয়ানোর গুরুত্বের বিষয়টি সবাইকে জানাতে হবে। আর পথশিশু, যৌন পেশায় জড়িতদের সন্তানসহ বিভিন্ন ধরনের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের এবং“যদি ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা না হয়, তাহলে শিশুদের আক্রান্ত হওয়া বা মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব নয়।



