প্রথমবারের মতো সরকারের পুঞ্জীভূত অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ সাড়ে ১১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছর শেষে এই ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৫৩ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা। এক বছরে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণসংক্রান্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছর শেষে সরকারের পুঞ্জীভূত অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা।
গত অর্থবছরে ব্যাংকব্যবস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার মোট ১ লাখ ৩১ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। ওই অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা বেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে।
ব্যাংক থেকে ঋণ বেড়েছে ৫৪ হাজার কোটি টাকা
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে শুধু ব্যাংকব্যবস্থা থেকেই সরকার নিট ১ লাখ ৩১ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। আগের অর্থবছরে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৭ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। ফলে এক বছরে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ বেড়েছে ৫৪ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত থেকে গত অর্থবছরে সরকারের নিট ঋণ ছিল মাত্র ১৯২ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এই খাত থেকে সরকার ৪২ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা নিট ঋণ নিয়েছিল।
গত অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। আর ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২১ হাজার কোটি টাকা।
অভ্যন্তরীণ ঋণের বড় উৎস ব্যাংক
২০২৫–২৬ অর্থবছর শেষে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের মধ্যে ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এক বছরে সরকারের পুঞ্জীভূত ব্যাংকঋণ বেড়েছে ২৪ শতাংশের বেশি।
ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত থেকে নেওয়া ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের নেওয়া ঋণের বড় অংশ এসেছে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে ব্যাংক খাত। আগে সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে সরকার বড় অঙ্কের ঋণ নিত। তবে গত কয়েক বছরে এ পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এসেছে। সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমে যাওয়ায় এ খাতে বিনিয়োগে মানুষের আগ্রহ কমেছে। ফলে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার প্রত্যাশিত পরিমাণ ঋণ সংগ্রহ করতে পারছে না।
দেশি-বিদেশি ঋণ প্রায় সমান
এদিকে সরকারের বিদেশি ঋণের স্থিতিও বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে সরকারের বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ৯১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৯ হাজার ১০০ কোটি ডলার। প্রতি ডলার ১২৫ টাকা হিসাবে এর পরিমাণ দেশীয় মুদ্রায় ১১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকার বেশি।
তবে গত জুন শেষে সরকারের বিদেশি ঋণের সর্বশেষ হিসাব এখনো প্রকাশিত হয়নি। ফলে ২০২৫–২৬ অর্থবছর শেষে বিদেশি ঋণের স্থিতি কত হয়েছে, তা জানা যায়নি। মার্চের হিসাব বিবেচনায় নিলে সরকারের দেশি ও বিদেশি ঋণের পরিমাণ প্রায় সমান।
দেশি ও বিদেশি ঋণ মিলিয়ে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকা। ঋণের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুদ পরিশোধের চাপও বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, সরকারের ব্যয়ের বড় খাতগুলোর একটি হয়ে উঠেছে ঋণের সুদ পরিশোধ। দেশি ও বিদেশি—উভয় ঋণের সুদ পরিশোধে সরকারকে বাজেটে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে। চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
তারা আরো বলছেন, দেশি ও বিদেশি ঋণের বোঝা ক্রমাগত বাড়ছে। এর সঙ্গে সুদ পরিশোধের চাপও বাড়ছে। ঋণ পরিশোধ সরকারের ব্যয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাতে পরিণত হয়েছে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে ঋণ পরিশোধের জন্যও নতুন করে ঋণ নিতে হচ্ছে। এতে দেশ বিপজ্জনক ঋণঝুঁকির দিকে যাচ্ছে। পাশাপাশি বিদেশি ঋণের সুদও বাড়ছে। বড় কিছু ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে আসায় ভবিষ্যতে সুদ পরিশোধের চাপ আরও বাড়তে পারে। এই চাপ সামাল দিতে সরকারের ব্যয়ে অপচয় কমানোর পাশাপাশি আয় বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।




