সিডনি: অস্ট্রেলিয়ার বিমান চলাচলের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় সূচিত হতে যাচ্ছে। আজ সকালে প্রথম বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী ফ্লাইট উড্ডয়নের কথা রয়েছে। স্থানীয় সময় সকাল ১১টায় জেটস্টারের JQ362 ফ্লাইটটি গোল্ড কোস্টের উদ্দেশে যাত্রা করবে। এতে থাকবেন টিকিট কাটা যাত্রী, জেটস্টারের প্রধান নির্বাহী স্টেফ টুলি এবং কয়েকজন সাংবাদিক।
নতুন বিমানবন্দরটির যাত্রীসেবা চালুর মধ্য দিয়ে সিডনির বিমান পরিবহন ব্যবস্থায় যুক্ত হচ্ছে দ্বিতীয় বড় যাত্রীবাহী বিমানবন্দর। দীর্ঘ পরিকল্পনা, নির্মাণকাজ ও পরীক্ষামূলক পরিচালনার পর এই যাত্রা শুরু হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার অবকাঠামো ও পরিবহনবিষয়ক সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির পরিকল্পনায় প্রায় ১৫ বছর এবং নির্মাণে সাত বছর সময় লেগেছে।
জেটস্টারের প্রধান নির্বাহী স্টেফ টুলি দিনটিকে অস্ট্রেলিয়ার বিমান চলাচলের জন্য ‘ঐতিহাসিক দিন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, নতুন বিমানবন্দর থেকে ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে পশ্চিম সিডনির বাসিন্দারা আরও বেশি গন্তব্যে যাতায়াতের সুযোগ পাবেন এবং কম ভাড়ায় বিমান ভ্রমণের বিকল্প বাড়বে।
জেটস্টারের এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে আসছে, যখন পশ্চিম সিডনি দ্রুত জনসংখ্যা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নতুন বিমানবন্দরটি শুধু যাত্রী পরিবহনের কেন্দ্র নয়, ভবিষ্যতে আঞ্চলিক অর্থনীতি, পর্যটন, পণ্য পরিবহন ও কর্মসংস্থানেরও গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
আজকের উদ্বোধনী বাণিজ্যিক ফ্লাইটটি পরিচালনা করবে অস্ট্রেলিয়ার স্বল্পমূল্যের বিমান সংস্থা জেটস্টারে। গোল্ড কোস্টের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের মধ্য দিয়ে নতুন বিমানবন্দরের যাত্রীসেবার আনুষ্ঠানিক সূচনা হবে।
বিমানবন্দর চালুর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গত সেপ্টেম্বরে জেটস্টারের একটি পরীক্ষামূলক ফ্লাইট পরিচালিত হয়েছিল। ওই পরীক্ষায় উড়োজাহাজ অবতরণ, টার্মিনালে প্রবেশ, যাত্রীসেবাসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম এবং পুনরায় উড্ডয়নের প্রস্তুতি যাচাই করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল প্রথম বাণিজ্যিক ফ্লাইটের আগে বিমানবন্দরের পরিচালনাগত প্রস্তুতি নিশ্চিত করা।
জেটস্টারের ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে পশ্চিম সিডনি থেকে মেলবোর্ন, গোল্ড কোস্ট ও ব্রিসবেনে ফ্লাইট পরিচালিত হবে। মেলবোর্ন রুটে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ১৪টি, গোল্ড কোস্টে চারটি এবং ব্রিসবেনে তিনটি ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা জানানো হয়েছে। তবে বিমানবন্দরের উদ্বোধনী দিনের সূচি এবং পরবর্তী নিয়মিত ফ্লাইটের সময়সূচি আলাদা হতে পারে; যাত্রীদের টিকিটের তথ্য যাচাই করে যাত্রা করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
আগামীকাল থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট: নতুন বিমানবন্দরটির নাম আন্তর্জাতিক হলেও যাত্রীসেবার প্রথম দিন শুরু হচ্ছে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট দিয়ে। আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহন শুরু হওয়ার কথা পরদিন, ২৬ অক্টোবর। সরকারি ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, নিউজিল্যান্ডের জাতীয় বিমান সংস্থা পশ্চিম সিডনি থেকে অকল্যান্ড রুটে প্রথম আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী পরিষেবা চালু করবে। এরপর ২৩ নভেম্বর থেকে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দরে দৈনিক ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা করেছে। এসব পরিষেবা চালু হলে পশ্চিম সিডনির যাত্রীরা আন্তর্জাতিক গন্তব্যে যাওয়ার জন্য আরও একটি বিমানবন্দর ব্যবহার করতে পারবেন। এতে বিশেষ করে পশ্চিম সিডনি ও আশপাশের এলাকায় বসবাসকারী যাত্রীদের যাতায়াতের বিকল্প বাড়বে। তবে নতুন বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ফ্লাইটের সংখ্যা, গন্তব্য এবং ভাড়া নির্ভর করবে বিমান সংস্থাগুলোর বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত ও যাত্রী চাহিদার ওপর।
২৪ ঘণ্টা চালু থাকবে বিমানবন্দর: নতুন বিমানবন্দরটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা পরিচালনার জন্য পরিকল্পিত। সিডনির বিদ্যমান কিংসফোর্ড স্মিথ বিমানবন্দরে রাতের ফ্লাইট চলাচলে বিধিনিষেধ থাকায় নতুন বিমানবন্দরটি বিশেষ করে রাতের পণ্য পরিবহন ও ভবিষ্যৎ বিমান চলাচলের সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১ নভেম্বর ২০২৬ থেকে পশ্চিম সিডনি বিমানবন্দরকে রাতের বিমান চলাচলের জন্য কার্যকর করার ব্যবস্থা নেওয়ার কথা রয়েছে। একই সময়ে বিদ্যমান সিডনি বিমানবন্দরে রাতের নির্দিষ্ট সময়ে পণ্যবাহী উড়োজাহাজের চলাচল বন্ধ করার পরিকল্পনাও রয়েছে, যদিও জরুরি পরিস্থিতি ও অনুমোদিত ব্যতিক্রম বহাল থাকবে।
বিমানবন্দরটিতে যাত্রী, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ও পণ্য পরিবহনের জন্য সমন্বিত অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে বছরে সর্বোচ্চ এক কোটি যাত্রী পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে এটি চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে চাহিদা বাড়লে সক্ষমতা আরও সম্প্রসারণের সুযোগ থাকবে।
পশ্চিম সিডনির অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা: নতুন বিমানবন্দরটির প্রভাব শুধু বিমান ভ্রমণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পশ্চিম সিডনিতে ব্যবসা, পরিবহন, পর্যটন, হোটেল, খাদ্য সরবরাহ, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, গুদামজাতকরণ ও পণ্য পরিবহন খাতে নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিমানবন্দরটি পূর্ণমাত্রায় কার্যক্রম শুরু করলে এর আশপাশের এলাকায় লজিস্টিকস, বাণিজ্যিক পরিবহন, গুদাম ও সরবরাহব্যবস্থার সম্প্রসারণ ঘটতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়লে পর্যটক ও ব্যবসায়িক ভ্রমণকারীদের যাতায়াতও সহজ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
২০২৭ সালে যুক্ত হবে কান্তাসের ফ্লাইট: নতুন বিমানবন্দরের প্রাথমিক পর্যায়ের কার্যক্রমে জেটস্টার প্রধান ভূমিকা রাখলেও পরবর্তী সময়ে আরও বিমান সংস্থা যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কান্তাস গ্রুপের মূল বিমান সংস্থা কান্টাস -এর সহযোগী কান্টাস লিংক ২৮ মার্চ ২০২৭ থেকে পশ্চিম সিডনি বিমানবন্দর থেকে মেলবোর্ন ও ব্রিসবেনে ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা করেছে।
সিডনির বিমান পরিবহনে নতুন অধ্যায়: সিডনির প্রধান বিমানবন্দর কিংসফোর্ড স্মিথ দীর্ঘদিন ধরে দেশটির অন্যতম ব্যস্ত বিমান পরিবহন কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি, যাত্রী চাহিদা এবং পণ্য পরিবহনের সম্প্রসারণের কারণে বিকল্প বিমানবন্দরের প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছিল।
পশ্চিম সিডনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সেই চাহিদা পূরণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। নতুন বিমানবন্দরটি চালু হওয়ার ফলে পশ্চিমাঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য ভ্রমণের নতুন সুযোগ তৈরি হবে এবং সিডনির বিমান পরিবহনব্যবস্থায় অতিরিক্ত সক্ষমতা যুক্ত হবে।
আজ সকাল ১১টায় নির্ধারিত জেটস্টারের গোল্ড কোস্টগামী ফ্লাইটটি তাই কেবল একটি নতুন রুটের সূচনা নয়; এটি পশ্চিম সিডনির পরিবহন, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ভবিষ্যৎ বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।




