মূল কনটেন্টে যান
সোশ্যাল মিডিয়ায় যুক্ত থাকুন
ব্রেকিং
পিছিয়ে থেকেও ব্রাজিলে লুলার বিস্ময়কর বিজয়, চতুর্থবার প্রেসিডেন্ট: মোদিসহ বিশ্বনেতাদের অভিনন্দন◆ইরানে হামলার হুমকি থেকে সরে এলেন ট্রাম্প◆যাত্রা শুরু ওয়েস্টার্ন সিডনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের, আজ উড়ছে প্রথম বাণিজ্যিক ও কাল থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট◆ফের ডিভি লটারি, তালিকায় নেই বাংলাদেশ◆৩০ অক্টোবর চালু হচ্ছে সিডনির নতুন মেট্রো◆তিব্বতে ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প, নিহত ১৬ : বিধ্বস্ত ৩ শতাধিক বাড়িঘর◆পিছিয়ে থেকেও ব্রাজিলে লুলার বিস্ময়কর বিজয়, চতুর্থবার প্রেসিডেন্ট: মোদিসহ বিশ্বনেতাদের অভিনন্দন◆ইরানে হামলার হুমকি থেকে সরে এলেন ট্রাম্প◆যাত্রা শুরু ওয়েস্টার্ন সিডনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের, আজ উড়ছে প্রথম বাণিজ্যিক ও কাল থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট◆ফের ডিভি লটারি, তালিকায় নেই বাংলাদেশ◆৩০ অক্টোবর চালু হচ্ছে সিডনির নতুন মেট্রো◆তিব্বতে ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প, নিহত ১৬ : বিধ্বস্ত ৩ শতাধিক বাড়িঘর◆
মতামত

আওয়ামী লীগকে কি মুছে ফেলা যাবে?

পথিক চৌধুরী, ঢাকা থেকে ১ মাস আগে শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৪৫২৫ বার পঠিত

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ইতিহাস সাত দশকেরও বেশি সময়ের। ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন, ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ—দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর সঙ্গে দলটির নাম গভীরভাবে যুক্ত। তবে একই সঙ্গে দলটি বিভিন্ন সময়ে বিভক্তি, সামরিক শাসন, গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং নেতৃত্বের সংকটেরও মুখোমুখি হয়েছে।

বর্তমানে আওয়ামী লীগ আবারও দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকটগুলোর একটি সময় পার করছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং নির্বাচন কমিশনে দলটির নিবন্ধন স্থগিত রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের এই দল কি সাংগঠনিক ও রাজনৈতিকভাবে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, নাকি বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে আওয়ামী লীগের অধ্যায় শেষ হয়ে যাবে?

প্রতিষ্ঠা থেকে মুক্তিযুদ্ধ

আওয়ামী লীগের শিকড় ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের মধ্যে। ঢাকার রোজ গার্ডেনে দলটির প্রতিষ্ঠা হয়। পরে ১৯৫৫ সালের কাউন্সিলে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘আওয়ামী লীগ’ নাম গ্রহণ করা হয়।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগ গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করে। এরপর ভাষার অধিকার, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনে দলটি ক্রমেই পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার রাজনৈতিক পথকে আরও সুস্পষ্ট করে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আওয়ামী লীগের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নেতৃত্বে মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্বে দলটির ভূমিকা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

১৯৭৫: নেতৃত্বের বিপর্যয়

স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ সরকার যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কঠিন দায়িত্ব নেয়। তবে অর্থনৈতিক সংকট, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সরকারের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে।

এর কয়েক মাসের মধ্যেই ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যা করা হয়। এরপর ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতা—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামান—হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। ফলে আওয়ামী লীগ ভয়াবহ নেতৃত্বশূন্যতার মধ্যে পড়ে।

সংকটের মধ্যেও সাংগঠনিক পুনর্গঠন

১৯৭৫-এর পর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অস্তিত্ব বড় ধরনের সংকটে পড়ে। সামরিক শাসনের রাজনৈতিক পরিবেশে দলের অনেক নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হন, অনেকে আত্মগোপনে চলে যান এবং দলীয় কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে সীমিত হয়ে পড়ে।

এই সময়ে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের সংগঠিত করা, রাজনৈতিক বন্দিদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৭৭ সালের এপ্রিল মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিলের সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং পরবর্তী সময়ে দলের পুনর্গঠনে দেশব্যাপী কাজ করেন।

এই পর্যায়ে আবদুর রাজ্জাকসহ একাধিক নেতা কারামুক্ত হয়ে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করতে ভূমিকা রাখেন। আবদুর রাজ্জাক ১৯৭৮ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

জিয়া ও এরশাদের আমল

জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসন এবং পরবর্তী সময়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনামলেও আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে টিকে থাকে।

১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩৯টি আসন পায়। পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনা দীর্ঘ নির্বাসন শেষে ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও আওয়ামী লীগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় এবং বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট গঠন করে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালায়। একই সময়ে দলটি অভ্যন্তরীণ বিভক্তিরও মুখোমুখি হয়। আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে একটি অংশ ১৯৮৩ সালে আলাদা হয়ে বাকশাল পুনর্গঠন করে; পরে ১৯৯২ সালে সেই ধারার সঙ্গে আওয়ামী লীগের পুনরায় একীভূত হওয়ার ঘটনা ঘটে।

দীর্ঘ সময়ের রাষ্ট্রক্ষমতা

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলটি দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা সরকার পরিচালনা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় তৈরি করে।

তবে এই দীর্ঘ শাসনামল নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধও ক্রমশ তীব্র হয়েছে। বিরোধী দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিভিন্ন সময়ে নির্বাচন, রাজনৈতিক অধিকার, মানবাধিকার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে অভিযোগ তুলেছে। আওয়ামী লীগ এসব অভিযোগের অনেকগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে এবং তাদের সরকারের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার বিষয়টি তুলে ধরেছে।

২০২৪-এর পর নতুন বাস্তবতা

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন এবং শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগ নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়।

২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। সরকার জাতীয় নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানায়। একই সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনে পরিবর্তন এনে রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়। আওয়ামী লীগ এই নিষেধাজ্ঞাকে অবৈধ বলে প্রত্যাখ্যান করে।

পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের নির্বাচন কমিশন নিবন্ধনও স্থগিত করা হয়। ফলে দলটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে চলে যায়। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের পরবর্তী নির্বাচনের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তি নিয়েও বিতর্ক তৈরি করেছে।

তাহলে কি আওয়ামী লীগ মুছে যাবে?          

এই প্রশ্নের উত্তর ইতিহাসের পাশাপাশি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপরও নির্ভর করছে।

একটি রাজনৈতিক দলকে শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের নির্বাচনী ফলাফল বা ক্ষমতায় থাকার মাধ্যমে মূল্যায়ন করা যায় না। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ১৯৭৫-এর পর দলটি নেতৃত্বের বড় অংশ হারিয়েও পুনর্গঠিত হয়েছে; সামরিক শাসনের সময়ও নির্বাচনে অংশ নিয়েছে; অভ্যন্তরীণ বিভক্তির পর পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরেছে। শুধু ‘আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলা যাবে কি না’ তা নয়; বরং বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দলটি কীভাবে, কোন সাংগঠনিক কাঠামোয় এবং কোন রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে ভবিষ্যতে ফিরে আসতে পারে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

বিজ্ঞাপনবিজ্ঞাপন