রাজধানীর ইসিবি চত্বর এলাকায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ’ স্টুডিওসহ নিউ গিনি প্রপার্টিজের স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যের জবাব দিয়েছেন সালমান মুক্তাদির। মন্ত্রী তার ফেসবুক লাইভের বক্তব্যকে ‘বিতর্কের জন্ম দিয়েছে’ বলে মন্তব্য করার পাশাপাশি মামলা না করার বিষয়টি তুলে ধরলে পাল্টা ভিডিও বার্তায় সালমান দাবি করেন, হামলার পর রাতেই তিনি ক্যান্টনমেন্ট থানায় গিয়ে মামলা করতে চাইলেও তা নেওয়া হয়নি।
রোববার দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘‘যে ভদ্রলোক ফেইসবুকে লাইভে এসে অভিযোগটি করছেন, তিনি কি কোনো মামলা দায়ের করেছেন? করেননি। এই লাইভ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।’’
সালমান মুক্তাদির পরে দেওয়া ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘‘মামলা কেন নেওয়া হয়নি, সেই প্রশ্ন তো আমার।’’ তার দাবি, ঘটনার পর তিনি রাতেই ক্যান্টনমেন্ট থানায় যান এবং পরদিন ভোর পর্যন্ত সেখানে ছিলেন। এরপরও মামলা নেওয়া হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
ইসিবি চত্বরের দক্ষিণ মানিকদীর নিউ গিনি প্রপার্টিজের আবাসন প্রকল্পে শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। সালমানের ব্রাউনফিশ স্টুডিও ছাড়াও নিউ গিনি প্রপার্টিজের অফিস ও আশপাশের স্থাপনায় হামলা হয়। পুলিশ ৯৯৯ নম্বরে ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় এবং এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। ঘটনাস্থল থেকে গুলির খোসা ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের কথাও জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, নিউ গিনি প্রপার্টিজের জমি নিয়ে বিরোধের জেরে হামলার ঘটনা ঘটতে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক তদন্তে প্রায় ৩৫ কাঠার একটি বিতর্কিত জমি নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে। এক পক্ষ আবাসন নির্মাতা এবং অন্য পক্ষ একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক প্রতিবেদনে ওই সামরিক কর্মকর্তার পক্ষে কিছু লোক রাতের অন্ধকারে জায়গাটি দখল করতে গিয়ে ভাঙচুর করেছে বলে জানা গেছে।
তবে এ ঘটনায় এখনো বিস্তারিত তদন্ত শেষ হয়নি বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রাথমিক তদন্তটি খুবই সংক্ষিপ্ত এবং আরও বিস্তারিত তদন্ত প্রয়োজন। মামলা ও সাধারণ ডায়েরির আইনগত প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।
সালমান মুক্তাদির ঘটনার পর দেওয়া ফেসবুক লাইভে স্টুডিওর ভাঙচুরের চিত্র তুলে ধরে এটিকে ‘রবারি, চাঁদাবাজি ও ডেস্ট্রাকশন’ হিসেবে বর্ণনা করেন। একই সঙ্গে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তার কোনো ব্যক্তিগত রাগ বা অভিযোগ নেই; তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অনুযায়ী কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, সেটি দেখার বিষয়।
রোববার সচিবালয়ে সালমানের বক্তব্য প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তিনি একপর্যায়ে বলেছেন, তার কাছে কেউ চাঁদা দাবি করেনি এবং দাবি করলে তিনি দিতেন। মন্ত্রীর ভাষ্য, ‘‘যার কাছে চাঁদা দাবি করা হয়নি, তিনি বলছেন ‘চাইলে দিতেন’। তাহলে তো চিহ্নিত কেউ নেই। এরপর তিনি বলছেন বিএনপি চাঁদা চেয়েছে—এটি একটি ঢালাও অভিযোগ। তিনি যদি নির্দিষ্ট মামলা করেন, আমরা সেটা তদন্ত করে দেখব।’’
এর জবাবে সালমান মুক্তাদির বলেন, ঘটনার কারণ ভূমি বিরোধ, চাঁদাবাজি কিংবা হামলাকারীদের রাজনৈতিক পরিচয়—যাই হোক না কেন, একজন নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের দায়িত্ব। তিনি বলেন, ‘‘আমরা এখানে ইনভেস্টিগেশনের জন্য আপনার কাছে আসিনি, আমরা আসছি অ্যাকশনের জন্য।’’
বিএনপির নাম জড়ানোর বিষয়ে সালমান দাবি করেন, হামলায় আটক ব্যক্তিরাই বিএনপির নাম বলেছে। তবে এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততার বিষয় নিশ্চিত করা হয়নি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বিএনপির বিরুদ্ধে সালমানের অভিযোগকে ‘ঢালাও’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘‘বিএনপি চাঁদাবাজ দল, এই ঢালাও অভিযোগের কোনো মানে নেই। যদি তিনি কোনো মামলা করেন স্পেসিফিক, সেটা তদন্ত হবে।’’
এদিকে সালমান মুক্তাদির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘টুকটাক ভাঙচুর’ মন্তব্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ঘটনাটি শুধু ভাঙচুর নয়; হামলাকারীরা সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে সার্ভার পর্যন্ত নিয়ে গেছে। এ ঘটনাকে ‘টুকটাক ভাঙচুর’ হিসেবে উপস্থাপন করায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
হামলার পর দেওয়া বক্তব্যে সালমান বলেন, স্টুডিওতে থাকা বিভিন্ন সরঞ্জাম ও ক্লায়েন্টদের কাজের জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এতে তার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে ব্যক্তিগত ক্ষতির চেয়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নটিকেই তিনি বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।
হামলার স্থানটি ঢাকা-১৭ আসনের আওতাধীন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সংসদীয় আসন—এ বিষয়টিও ভিডিও বার্তায় তুলে ধরেন সালমান। তিনি প্রশ্ন করেন, প্রধানমন্ত্রীর আসনের কাছাকাছি এলাকায় এমন ঘটনা ঘটলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের দায়িত্বশীলদের আরও গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি দেখা উচিত কি না।
সালমান বলেন, তিনি ঘটনাটিকে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করতে চান না। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের লোকজন তার সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তিনি তাতে সাড়া দেননি বলে দাবি করেন। তার বক্তব্য, ঘটনার সঙ্গে বিএনপি, আওয়ামী লীগ কিংবা অন্য কোনো পক্ষের রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও তার মূল দাবি হচ্ছে নিরাপত্তা ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সালমানের স্থাপনায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে—এটি তারা দেখেছেন। তবে এ বিষয়ে তার পক্ষ থেকে কোনো মামলা করা হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, ঘটনাটি নিয়ে মামলা হতে পারে এবং তদন্তের অগ্রগতির পর বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে।
সালমান মুক্তাদির তার ভিডিও বার্তায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, সরকার ক্ষমতায় থাকায় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও সরকারের। তিনি বলেন, অতীতেও বিভিন্ন সরকারের সময়ে ধর্ষণ, হত্যা, চাঁদাবাজি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি কথা বলেছেন এবং বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধেও প্রয়োজন হলে কথা বলবেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কিছু আলামত উদ্ধার হয়েছে। গুলির খোসা ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্তাধীন থাকায় আইনগত প্রক্রিয়া এগোনোর পর এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।
ঘটনাটি নিয়ে পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। জমি নিয়ে বিরোধের সঙ্গে হামলার সম্পর্ক, হামলাকারীদের পরিচয় এবং স্টুডিওসহ অন্যান্য স্থাপনায় হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় কারা জড়িত—এসব বিষয়ে তদন্তের পর আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে।




