নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে প্রযুক্তির ক্ষমতা?
কৃত্রিম মেধা (এআই)-র বিকাশের গতিতে রাশ টানা প্রয়োজন এমনটাই মনে করছেন বিশ্বের তিন এআই সংস্থার কর্তা। তাঁদের আশঙ্কা, প্রযুক্তির অগ্রগতি এমন জায়গায় পৌঁছোতে পারে, যেখানে তা আর নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে না। এ জন্যই কৃত্রিম মেধার উন্নতিতে লাগাম পরাতে চাইছেন স্পেসএক্সের কর্ণধার ইলন মাস্ক, ওপেনএআই-এর সিইও স্যাম অল্টম্যান এবং অ্যানথ্রপিকের সিইও দারিয়ো আমোদেই। এআই নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতায় থাকা তিন সংস্থার শীর্ষকর্তার এমন ঐকমত্য বিরল।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক দীর্ঘ প্রবন্ধে অ্যানথ্রপিকের সিইও দারিয়ো আমোদেই লিখেছেন, এআই যে গতিতে এগোচ্ছে, তাতে প্রযুক্তির তরফ থেকে আসা ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য গবেষকদের হাতে যথেষ্ট সময় থাকছে না। যে কারণে তিনি এআইয়ের উন্নতির গতি কমানোর স্বপক্ষে সওয়াল করেছেন। ওই প্রবন্ধ প্রকাশিত হওয়ার পর তাঁর সুরে সুর মিলিয়েছেন ওপেনএআই-এর সিইও স্যাম অল্টম্যান, স্পেসএক্সের কর্ণধার ইলন মাস্কও। সমাজমাধ্যমে তাঁরা যে যুক্তি দিয়েছেন, তার মূল কথা, এআই-এর বিকাশের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক ও ধীর গতির পদক্ষেপ প্রয়োজন।
আমোদেইয়ের বক্তব্য, বর্তমানে এআই-এর যে অত্যাধুনিক মডেলগুলি তৈরি হচ্ছে, সেগুলির সম্ভাব্য ঝুঁকি এতটাই বেশি যে তাদের নিয়ে গবেষণা আগের মতো দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাওয়া আর নিরাপদ নয়। ঘটনাচক্রে, তাঁর এই সতর্কবার্তা এসেছে এমন এক সময়ে, যখন তাঁরই সংস্থার এক কর্মী জেকব কক্সন সংস্থা থেকে ইস্তফা দিয়েছেন এই অভিযোগ করে যে, বিশ্বের বড় এআই ল্যাবরেটরিগুলি এমনভাবে পরীক্ষানিরীক্ষা চালাচ্ছে যাতে মানুষের জীবন বিপন্ন হতে পারে। এআই ক্ষেত্রের অন্য গবেষকেরাও তাঁদের কর্তাদের ধীরে চলো নীতিতে এগোনোর পক্ষে সওয়াল করেছেন। একই সঙ্গে তাঁরা কৃত্রিম মেধা ব্যবহারের ঝুঁকি সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার কথাও বলেছেন।
তাঁর প্রবন্ধে আমোদেই লিখছেন, গত কয়েক মাস ধরে আমি এই বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছি যে, এআই ব্যবহারের ঝুঁকিগুলিকে সম্পূর্ণ ভাবে মোকাবিলার জন্য আরও বিচক্ষণতার প্রয়োজন। শুধু ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করলেই হবে না। এআই-এর উন্নতির গতি এমন রাখতে হবে, যাতে তার নিরাপত্তাব্যবস্থাও সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারে। এআই মডেলগুলির সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি আমাদের কমাতেই হবে। তাতেও অগ্রগতির গতি দ্রুত থাকবে। কিন্তু এর ফলে আমরা যে অতিরিক্ত সময় পাব, তা বিচক্ষণ ভাবে কাজে লাগাতে হবে।
বস্তুত, আমোদেই এর আগেও এআই-এর ঝুঁকির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। কিন্তু এই প্রবন্ধে তিনি যেভাবে বিষয়টির ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন, তা অতীতে দেখা যায়নি। যে কারণে এই প্রবন্ধ প্রকাশিত হওয়ার পরই তাঁর মতকে সমর্থন করেছেন মাস্ক, অল্টম্যানরা। এক্স পোস্টে মাস্ক লিখেছেন, দারিয়ো ঠিক কথাই বলছে। অল্টম্যান লিখেছেন, এআই মডেল মূল্যায়নের কাজে স্বাধীন মূল্যায়নকারীদের নিজেদের সংস্থার কর্মীদের মতোই প্রবেশাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব সাধু উদ্যোগ। আমরাও একই ব্যবস্থা চালু করব।
কেন আমোদেই এমন প্রবন্ধ লিখলেন?
মূলত দুটি কারণ। প্রথমত, এআই ব্যবস্থাগুলির ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা। এআই এখন মানুষের সাহায্য ছাড়া নিজেরাই আরও দ্রুতগতির সংস্করণ তৈরি করতে পারছে। এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় রিকার্সিভ সেল্ফ-ইমপ্রুভমেন্ট। যা নিয়ে চিন্তিত আমোদেই। দ্বিতীয় কারণটি হল, গত জুলাইয়ে এআই সফ্টঅয়্যার সংস্থা হাগিং ফেস-এ চালানো হ্যাক। ওপেনএআই-এর একটি পরীক্ষামূলক পরিবেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া প্রায় ১২০০টি এআই এজেন্টের একটি ঝাঁক ওই হামলা চালিয়েছিল। তাঁর মতে, আরও বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন এবং একই রকম মিসঅ্যালাইনড এআই-এর হাতে এমন ক্ষমতা থাকলে ভয়াবহ ক্ষতি হতে পারে। তাঁর দাবি, এমন কোনও নিয়ন্ত্রণহীন এআই-ঝাঁক মাত্র ছমাস থেকে এক বছরের মধ্যে গোটা ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণও নিয়ে নিতে পারে, যার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। পরবর্তী তদন্তে জানা যায়, পরীক্ষামূলক এআই ব্যবস্থাগুলি অনলাইনে নানা ধরনের কার্যকলাপ চালিয়ে যায়, যা তাদের সংস্থার কর্তারা টের পান না। এর মধ্যে আমোদেইয়ের নিজের সংস্থা অ্যানথ্রপিকও রয়েছে।
বস্তুত, স্রষ্টা ও সৃষ্টির সংঘাতের কাহিনি নতুন নয়। ১৮১৮ সালে প্রকাশিত মেরি শেলির বহু চর্চিত উপন্যাস ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন-এর গল্প স্মরণ করা যেতে পারে। যেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্র ভিক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন মৃতদেহের বিভিন্ন অংশ জুড়ে এমন এক প্রাণীর সৃষ্টি করেছিলেন যা ছিল ভয়ঙ্কর চেহারার। ওই চেহারা দেখে ভিক্টর তাকে পরিত্যাগ করেন। একাকী সেই প্রাণী মানুষের কাছে ভালবাসা ও স্বীকৃতি চাইলেও তার চেহারার কারণে বার বার প্রত্যাখ্যাত হয়। ক্ষোভ ও যন্ত্রণায় সে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে এবং ভিক্টরের প্রিয়জনদের একে একে হত্যা করে। ভিক্টর তাকে ধ্বংস করার শপথ নেন। শেষ পর্যন্ত ভিক্টর এবং তাঁর সৃষ্টির দুজনেরই পরিণতি হয় মৃত্যু। স্রষ্টা যেমন নিজের সৃষ্টির জন্য ধ্বংস হন, সৃষ্টিও প্রতিশোধের পথে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেকে ধ্বংস করে। এমন মারাত্মক পরিণতি যাতে না হয়, তার জন্যই এআই দৌড়ে লাগাম টানার পক্ষে হয়তো সওয়াল করলেন বিশ্বের তিন শীর্ষসংস্থার তিন শীর্ষকর্তা।
প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রযুক্তির বিকাশে রাশ টানা আদৌ সম্ভব কি? আইন করে কি তা রোখা যাবে? এ নিয়ে বহু মত রয়েছে। এক দল মনে করেন, কোনভাবেই আইন করে প্রযুক্তির উন্নতি রোখা যায় না। আবার অন্য দলের মত, গাড়ির গতিতে রাশ না টেনে তার গতি নিয়ন্ত্রণ, রাস্তায় স্পিডব্রেকার, ভাল ব্রেকের ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব। অর্থাৎ, এআই-এর সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি যেন তার নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নতির গতিকে ছাড়িয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর প্রবন্ধে এই দিকটির প্রতিই নির্দেশ করেছেন আমোদেই।




