ঢাকা: বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রায় নয় মাসের শাসনামলে আইনশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক সহিংসতা, দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি সরবরাহ ও নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে জনপরিসরে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ সামনে এসেছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজির অভিযোগ, গণপিটুনি এবং নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে দেশের মানবাধিকার ও জননিরাপত্তা পরিস্থিতির একাধিক উদ্বেগজনক দিক উঠে এসেছে। বাংলাদেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং সংগঠনটির নিজস্ব তথ্য সংগ্রহের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে সারাদেশে ৬৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় অন্তত চারজন নিহত এবং ৫২৭ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ২৩৬ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে এইচআরএসএসের তথ্য উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৭৯ জন ধর্ষণের শিকার। এ ছাড়া ৩৫ জন সাংবাদিক হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং কারাগারে ২১ বন্দির মৃত্যুর তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক সহিংসতা: দলীয় কোন্দলই বড় উদ্বেগ
এইচআরএসএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ৬৮টি ঘটনার মধ্যে ৩৫টিই বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধকে কেন্দ্র করে ঘটেছে। এসব ঘটনায় অন্তত ৩৪০ জন আহত এবং একজন নিহত হয়েছেন।
বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে সাতটি সংঘর্ষে ৬১ জন এবং বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে ছয়টি সংঘর্ষে ৪২ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে তিনটি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৬ জন। অন্যান্য রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যেও সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
আগস্ট মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ৭০টি ঘটনায় সাতজন নিহত ও ৫৩৬ জন আহত হয়েছিলেন। সে হিসাবে সেপ্টেম্বর মাসে ঘটনা, মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা কিছুটা কমেছে। কিন্তু সংঘর্ষের মোট সংখ্যা কমলেও ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং স্থানীয় পর্যায়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সহিংসতা অব্যাহত থাকার বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিদের ওপর পৃথক হামলার অন্তত ১২টি ঘটনায় সাতজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।
স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, কমিটি ও নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ, দখলদারত্ব এবং চাঁদাবাজির অভিযোগের মতো বিষয়গুলো কীভাবে সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি। এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক, অপরাধের অভিযোগের তদন্ত ও বিচার সমানভাবে কার্যকর হওয়া আইনের শাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
মব সহিংসতা: আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা
রাজনৈতিক সংঘর্ষের পাশাপাশি গণপিটুনি ও মব সহিংসতাও জননিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার এবং অন্যান্য অভিযোগকে কেন্দ্র করে মব সহিংসতার ৩৫টি ঘটনায় অন্তত নয়জন নিহত ও ৩২ জন আহত হয়েছেন।
আগস্ট মাসে এ ধরনের ৫৩টি ঘটনায় ২৮ জন নিহত এবং ৬২ জন আহত হয়েছিলেন। তুলনায় সেপ্টেম্বরে এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা ও হতাহতের পরিমাণ কমলেও, সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করে মারধর কিংবা হত্যা করার মতো ঘটনা বিচারব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
নারী ও শিশু নির্যাতন: উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান
নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। এইচআরএসএসের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে ২৩৬ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৭৯ জন ধর্ষণের শিকার, যার মধ্যে ৪৭ জন শিশু ও কিশোরী।
একই সময়ে ১৩ জন নারী ও কিশোরী সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৪৯ জন নারী ও শিশু। ধর্ষণের পর পাঁচজন নারী ও শিশুকে হত্যার তথ্যও প্রতিবেদনে রয়েছে। এ ছাড়া ধর্ষণের ঘটনার পর একজন নারীর আত্মহত্যার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। যৌতুক-সংক্রান্ত সহিংসতায় ছয়জন নারী ও কিশোরীর মৃত্যু এবং চারজন আহত হওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।
তবে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিভিন্ন উপশ্রেণির তথ্য একে অপরের সঙ্গে আংশিকভাবে মিলে যেতে পারে। তাই সব উপাত্ত যোগ করে মোট ভুক্তভোগীর সংখ্যা নির্ধারণ করা সমীচীন নয়।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা জবাবদিহি নিশ্চিত করার অন্যতম শর্ত। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি ও হয়রানির একাধিক ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাসজুড়ে অন্তত ২০টি ঘটনায় ৩৫ জন সাংবাদিক হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৬ জন আহত, ১২ জন লাঞ্ছিত এবং তিনজন হুমকির মুখে পড়েছেন। একজন সাংবাদিককে আটক করার তথ্যও রয়েছে। সংবাদ প্রকাশের জেরে দায়ের করা মামলায় তিন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
যশোরের কেশবপুর প্রেসক্লাবে হামলা এবং কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে সড়ক নির্মাণে অনিয়মের তথ্য সংগ্রহের সময় এক সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় নয়; এর ফলে অনিয়ম, দুর্নীতি ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সংবাদ প্রকাশের কারণে হয়রানির অভিযোগ খতিয়ে দেখা সরকারের দায়িত্বের অংশ।
সভা-সমাবেশ ও মতপ্রকাশের অধিকার
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে অন্তত ছয়টি সভা ও সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সরাসরি কিংবা পরোক্ষ বাধার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় অন্তত ৪৭ জন আহত হয়েছেন।
এ ছাড়া মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগে ১২টি ঘটনায় ১৪ জনকে আটক এবং ১২টি মামলা দায়েরের তথ্য প্রতিবেদনে রয়েছে। এসব মামলায় অন্তত ২৬ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
কারাগারে মৃত্যু ও হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ
সেপ্টেম্বর মাসে দেশের বিভিন্ন কারাগারে ২১ বন্দির মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে এইচআরএসএস। তাঁদের মধ্যে ১১ জন দণ্ডপ্রাপ্ত এবং ১০ জন বিচারাধীন বন্দি ছিলেন। সংস্থাটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে বা নির্যাতনের অভিযোগসংশ্লিষ্ট ঘটনায় অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজন নির্যাতনের শিকার হয়ে এবং দুজন হেফাজতে মারা গেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।




