ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরোধ আরও তীব্র হওয়ার মধ্যে রাশিয়ার ওপর আরোপিত একাধিক নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেছেন ট্রাম্প। শুক্রবার রাতে এক নির্বাহী আদেশে তিনি এসব নিষেধাজ্ঞার কয়েকটি কার্যকর না করার সিদ্ধান্ত জানান। এতে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের মধ্যে সমালোচনা শুরু হয়েছে।
মার্কিন কংগ্রেসে পাস হওয়ার পর গত সেপ্টেম্বরে ট্রাম্পের স্বাক্ষরে নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত আইনটি কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়ায় যায়। তবে নির্ধারিত সময়ের মাত্র দুই দিন আগে ট্রাম্প কিছু বিধিনিষেধ স্থগিত করেন। তাঁর যুক্তি, এ সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের ‘জাতীয় স্বার্থের’ জন্য প্রয়োজনীয়।
নতুন আইনে রাশিয়ার অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের শীর্ষ পাঁচ ক্রেতা দেশের পণ্যে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টকে দেওয়া হয়। এই তালিকায় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ চীন ও ভারত। পাশাপাশি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ দেশটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বিধিনিষেধ এবং বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলতে ব্যবহৃত রাশিয়ার তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধানও ছিল। এসব বিধানের বেশ কয়েকটি এখন স্থগিত করা হয়েছে।
ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছেন রাশিয়ার বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি একে ‘গুরুত্বপূর্ণ ও সত্যিকার অর্থে ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, নিষেধাজ্ঞাগুলো কার্যকর হলে রাশিয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক বাজারেরও বড় ধরনের ক্ষতি হতো। দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা উভয়ের জন্যই লাভজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে, মার্কিন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা এ সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছেন। ভার্জিনিয়ার কংগ্রেস সদস্য ডন বেয়ার অভিযোগ করেন, ট্রাম্পের পদক্ষেপ মস্কোর কাছে নতি স্বীকারের শামিল এবং ইউক্রেনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনকে দুর্বল করছে। তাঁর ভাষ্য, রাশিয়ার আগ্রাসনের শাস্তি নিশ্চিত করতে কংগ্রেস যে আইন প্রণয়ন করেছে, নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের সিদ্ধান্ত তার উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।
ওয়াশিংটন ও কিয়েভের সম্পর্কে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক ঘটনায় টানাপোড়েন বেড়েছে। গত সপ্তাহে রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তবে ইউক্রেন ও ইউরোপের মিত্ররা এর সমালোচনা করে।
জেলেনস্কি এ সিদ্ধান্তকে রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় অর্থ জোগানোর সঙ্গে তুলনা করেন। পরে ট্রাম্প দাবি করেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন একটি ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতিতে’ সম্মত হয়েছে, যার মাধ্যমে রুশ ডিজেল রপ্তানি সহজ হবে। তবে রাশিয়ার ধারাবাহিক হামলার পর ইউক্রেন আবারও রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে হামলা শুরু করে। এ ঘটনায় ট্রাম্প ইউক্রেনের পদক্ষেপকে ‘লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য করেন। জবাবে জেলেনস্কি বলেন, তিনি শুধু ইউক্রেনের স্বার্থ রক্ষা করছেন।
এদিকে, ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতায় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইউক্রেনের অভিযোগ, মার্কিন সহায়তায় ব্যবহৃত স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবস্থায় হঠাৎ গতি সীমিত করা হলে যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের ড্রোন অভিযান ব্যাহত হয় এবং রুশ হামলা মোকাবিলা কঠিন হয়ে পড়ে। জেলেনস্কি শুক্রবার জানান, স্টারলিংকের গতি তখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। তবে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বন্ধ করা কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে ইউক্রেনের স্টারলিংক সংযোগের গতি কমানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ট্রাম্প।
রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সর্বশেষ সিদ্ধান্তে ইউক্রেনের অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে। যুদ্ধ অব্যাহত থাকা অবস্থায় রাশিয়ার অর্থনৈতিক সক্ষমতা সীমিত করতে কঠোর নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজনীয়তার কথা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন জেলেনস্কি।




