হরমুজ প্রণালিতে সৌদি আরবের মালিকানাধীন একটি তেলবাহী সুপারট্যাংকারে ইরানের হামলায় দুই ফিলিপিনো নাবিক নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সৌদি আরব। সোমবার রাতে ‘সিদর’ নামের ট্যাংকারটি প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় হামলার শিকার হয়। একই সময়ে সৌদি অপরিশোধিত তেলবোঝাই আরেকটি ট্যাংকারও অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও সংকটজনক হয়ে উঠেছে।
সৌদি জাতীয় জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠান বাহরি বুধবার জানায়, তাদের পরিচালিত ‘সিদর’ সোমবার স্থানীয় সময় রাত ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সময় একটি ‘নিরাপত্তাজনিত ঘটনার’ মুখে পড়ে। এ ঘটনায় জাহাজটির দুই ফিলিপিনো নাবিক নিহত হয়েছেন। নিহতদের পরিবারের সদস্য, স্বজন ও সহকর্মীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে বাহরি।
পরে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরাসরি ইরানকে দায়ী করে। এক বিবৃতিতে তারা হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের সময় সৌদি ট্যাংকার ‘সিদর’-কে লক্ষ্য করে ইরানের হামলার নিন্দা জানায়। একই সঙ্গে জর্ডান, বাহরাইন ও কুয়েতের ওপর সাম্প্রতিক ইরানি হামলারও নিন্দা জানিয়ে উত্তেজনা কমানো এবং আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানায় রিয়াদ।
কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দুই ট্যাংকারে আঘাত
সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান মারিস্কস ও কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার রাতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বের হওয়ার সময় সৌদি অপরিশোধিত তেলবোঝাই দুটি সুপারট্যাংকার কয়েক মিনিটের ব্যবধানে অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুটি জাহাজেই প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল করে সৌদি অপরিশোধিত তেল ছিল।
মারিস্কসের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি পতাকাবাহী ‘সিদর’ ওমানের খাসাবের প্রায় ১৬ নটিক্যাল মাইল উত্তর-পূর্বে আঘাতের শিকার হয়। এর কয়েক মিনিট পর লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ‘সেনেগাল প্রসপারিটি’ নামের আরেকটি সুপারট্যাংকারেও তিনটি অজ্ঞাত প্রজেক্টাইল আঘাত হানে। ওই জাহাজের সব নাবিক নিরাপদে আছেন বলে জানা গেছে। একই এলাকার দুটি ঘটনার বিষয়ে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সংস্থাও প্রতিবেদন দিয়েছে।
তবে হামলায় কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বা কারা সরাসরি হামলা চালিয়েছে, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। সৌদি আরব ইরানকে দায়ী করলেও তেহরান এখনো এই অভিযোগের সরাসরি জবাব দেয়নি।
ইরানের পাল্টা দাবি
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) অবশ্য ভিন্ন দাবি করেছে। তাদের ভাষ্য, দুটি তেলবাহী ট্যাংকার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর তাগিদে হরমুজ প্রণালির একটি ‘অবৈধ পথে’ চলাচল করছিল। এ সময় জাহাজ দুটি মাইনে আঘাত করে বিস্ফোরিত হয় এবং পরে আগুন ধরে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রও ঘটনাটির বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করেনি। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ এবং মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে আইআরজিসির সাম্প্রতিক হামলার পর ইরানে নতুন করে বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
যুদ্ধের উত্তাপে আরও ঝুঁকিপূর্ণ হরমুজ
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে কয়েক মাস ধরেই নৌ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত এই জলপথ দিয়ে যায়। ফলে প্রণালিতে বড় ধরনের কোনো বাধা তৈরি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও তেলের বাজারে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে প্রণালিতে জাহাজ চলাচলও স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কমে গেছে। কেপলারের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার মাত্র চারটি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে, যেখানে আগের ১০ দিনের গড় ছিল প্রায় ১৩টি। এর আগে সোমবারও মাত্র পাঁচটি জাহাজ এই জলপথে চলাচল করেছিল।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘাতও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানে একাধিক বিমান হামলা চালানোর পর ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। জুলাইয়ের পর এটিকে দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় পাল্টাপাল্টি হামলা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তেল পরিবহনে রেকর্ড, কিন্তু বাড়ছে শঙ্কা
সংঘাতের মধ্যেও সোমবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহন হয়েছে। তবে হামলার কারণে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দ্রুত বাড়ছে। জাহাজগুলোকে ইরানের পছন্দের উত্তরের পথ এড়িয়ে ওমানের দিকের দক্ষিণাঞ্চলীয় রুট ব্যবহার করতে হচ্ছে; এই বিকল্প পথও এখন হামলার ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয়।
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল কার্যত অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। একদিকে ইরান জলপথটির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের দাবি বজায় রেখেছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র প্রণালিটি খোলা রাখার কথা বলে দক্ষিণাঞ্চলীয় রুটে জাহাজ চলাচলে সহায়তা করছে।
সৌদি ট্যাংকারে হামলায় দুই নাবিকের মৃত্যু সেই উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বাণিজ্যিক জাহাজে প্রাণহানির ঘটনা বাড়তে থাকলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল আরও কমে যাওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।



