বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিসহ কতিপয় রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনকারী ও ইতিহাসের মূল স্রোতধারার রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে চিরতরে নিষিদ্ধ ও ধ্বংস করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। তবে দলটির দীর্ঘ সংগ্রাম, ঐতিহাসিক শেকড় এবং ব্যাপক সাংগঠনিক শক্তির মুখে এই ষড়যন্ত্র শুরু থেকেই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়ে আসছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ষড়যন্ত্রের কালবায়ন ঃ স্বাধীনতার পর থেকেই নবগঠিত রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার বহু চক্রান্ত হয়েছে। ১৯৭২ সালে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও তাত্ত্বিক নেতা সিরাজুল আলম খান দল থেকে বেরিয়ে ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ কায়েমের লক্ষ্যে জাসদ গঠন করেন। সে সময় তথাকথিত গণবাহিনী সৃষ্টি করে পাটের মিলে আগুন, কৃত্রিম খাদ্য সংকট তৈরি এবং খুন-গুমের মাধ্যমে তৎকালীন সরকারকে নাজেহাল করে তোলা হয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী মেজর জিয়াউর রহমান আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার বহুমুখী চক্রান্ত শুরু করেন। কিন্তু সেই দুঃসময়েও দমে যায়নি দলটি। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করলে আওয়ামী লীগ আবার নতুন গতি ও মহিমায় ঘুরে দাঁড়ায়। জিয়ার মৃত্যুর পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে দিয়ে দল ও সরকার টিকিয়ে রাখার অপচেষ্টাও ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে দীর্ঘ ৯০-এর গণআন্দোলনে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে এবং ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসে।
বিএনপি আমলেই দেশজুড়ে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটে। হরকাতুল জিহাদ ও বাংলাভাইয়ের মতো উগ্র সংগঠনগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে এবং ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী ‘সেভেন সিস্টার্স’-এর ঘাঁটি বাংলার সীমান্ত এলাকায় গড়ে ওঠে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রহসনের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর স্বঘোষিত খুনি খন্দকার রশীদকে জিতিয়ে এনে সংসদে বসান খালেদা জিয়া। কিন্তু তীব্র গণআন্দোলনের মুখে মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে সেই সরকার পতন ঘটে।
রাষ্ট্রীয় সুশাসন ও জনকল্যাণে আওয়ামী লীগ ঃ ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ঘাঁটি উচ্ছেদ করে এবং দেশকে জঙ্গিবাদমুক্ত করার প্রাথমিক পদক্ষেপ নেয়। একই সঙ্গে ইনডেমনিটি আইন বাতিল করে ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে এবং ঘাতকদের ফাঁসি নিশ্চিত করে।
২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর দেশজুড়ে জঙ্গি তৎপরতা চরম আকার ধারণ করে। বিচারালয়, মাজার ও বিচারকদের ওপর সিরিজ বোমা হামলা চালানো হয়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলা চালিয়ে দলের সভাপতি ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। সেই বর্বরোচিত হামলায় আইভি রহমানসহ বহু নেতাকর্মী শহীদ হন এবং আহত হন দুই শতাধিক নেতাকর্মী।
সমস্ত প্রতিকূলতা ও চক্রান্ত মোকাবিলা করে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে এবং দীর্ঘ দেড় দশক সফলভাবে দেশ পরিচালনা করে। ২০২৪ সালে দেশি-বিদেশি নানামুখী ষড়যন্ত্রের মুখে সরকারের পটপরিবর্তন ঘটলেও দলের মূল ভিত্তি টলানো সম্ভব হয়নি।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ঃ বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি মনে করছে আওয়ামী লীগকে রাজনীতি থেকে চিরতরে নিষিদ্ধ করা যাবে। তবে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দক্ষতা, দেশব্যাপী তৃণমূলের গণভিত্তি এবং অভূতপূর্ব জনসমর্থন প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর উদ্বেগের প্রধান কারণ। সরকারের নীতিনির্ধারকরা আওয়ামী লীগের এই বিপুল জনসমর্থনে ভীত হয়ে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গায়েবি মামলা দায়ের ও মব কালচারের মাধ্যমে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
এরই মধ্যে দলীয় সভাপতি ও চারবারের সফল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আসার ঘোষণা আসার পর থেকেই সরকার ও বিরোধী জোটের ভেতরে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েও আওয়ামী লীগের আন্দোলনমুখী চেতনাকে দমানো সম্ভব হচ্ছে না। ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায় প্রমাণ করেছে যে, দেশি-বিদেশি কোনো ষড়যন্ত্রই এ দেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে থাকা আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করতে পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না।




