আগামী ডিসেম্বর মাসেই নির্বাসন ভেঙে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার দল আওয়ামী লীগ সেখানে বর্তমানে নিষিদ্ধ এবং দেশের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই তিনি ও তার দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করার পরিকল্পনা করছেন বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন।

টানা ২০ বছর ক্ষমতায় থাকা বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী এই প্রধানমন্ত্রী জানান, দুই বছর আগে দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া তিনি এবং তার দলের নেতাকর্মীরা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আদালতে হাজির হবেন। এর মাধ্যমে তার মতো একজন প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বাংলাদেশ সরকার কীভাবে মোকাবিলা করে, তা-ই পরখ করতে চান তিনি।
টেলিফোনে দেওয়া প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী এক সাক্ষাৎকারে ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা বলেন, “দেশে ফিরলে তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি মেরেও ফেলতে পারে। তাও আমাকে যেতেই হবে। আমার দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা চরম নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। মৃত্যু যদি আসেই, তবে আমি চাই তা আমার নিজের মাটিতেই আসুক—যেখানে আমার বাবা-মা সমাহিত আছেন এবং যেখানে তাদের রক্ত ঝরেছে।”
বাংলাদেশ সরকার এর আগে একাধিকবার শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করার জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। নির্বাসনে যাওয়ার পর এর আগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের লিখিত প্রশ্নের উত্তর দিলেও, এবারই প্রথম তিনি সরাসরি কোনো সাক্ষাৎকার দিলেন এবং দেশে ফেরার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা ও আদালতে আত্মসমর্পণের কথা উল্লেখ করলেন।
শেখ হাসিনা জানান, নির্বাসনে থাকা আওয়ামী লীগের অন্য জ্যেষ্ঠ নেতারাও তার সাথে ফিরবেন, যার মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও রয়েছেন, যিনি নিজেও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। তবে রয়টার্স স্বাধীনভাবে অন্য নেতাদের অবস্থান বা এ বিষয়ে তাদের মতামত নিশ্চিত করতে পারেনি। শেখ হাসিনা বলেন, “ঢাকার কর্তৃপক্ষ আমাকে ফিরিয়ে নিতে চায় এবং তারা ভারতকে বারবার চিঠি পাঠাচ্ছে। তাই আমি নিজেই চলে যাব।”
দিল্লি থেকে শেখ হাসিনা বলেন, “আমাদের প্রায় সব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে, অনেকেই আত্মগোপনে আছেন। তাই আমি বলেছি, এবার আমি বাড়ি ফিরছি এবং একদিন আপনারা সবাই চলে আসুন। আমরা সবাই একসাথে আদালতে গিয়ে আত্মসমর্পণ করব।” তবে তিনি ঠিক কোন তারিখে বা কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন, তা নির্দিষ্ট করে জানাননি। তিনি বলেন, “আমি বিচারে বিশ্বাস করি। যখন আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে, তখন মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে এই আদালত কতটা প্রহসনমূলক—আমি সেটাই প্রমাণ করতে চাই।”
শেখ হাসিনা জানান, দেশে ফেরার এই পরিকল্পনা নিয়ে ঢাকার অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে তার কোনো গোপন আলোচনা হয়নি। তিনি বলেন, “গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার এবং ন্যায়বিচার কোনো গোপন আলোচনার বিষয় নয়।” কারাগারে যাওয়ার বিষয়ে তিনি কোনো ভয় পাচ্ছেন না উল্লেখ করে বলেন, এর আগেও তিনি বহুবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। ১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি একাধিকবার আটক হন। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও দুর্নীতির অভিযোগে তিনি কারাবরণ করেন এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে মুক্ত হন।
দেশ ছাড়ার পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি জানান, সেদিন জনতা তার বাসভবনের দিকে অগ্রসর হওয়ায় তাঁর জীবননাশের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তিনি বলেন, “একটি সরকার যখন দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে, তখন কিছু ভুল হতেই পারে—কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। তবে সরকারের ভালো-মন্দ, ভুল-ত্রুটি বিচার করার অধিকার কেবল জনগণের। আমি সেই বিচার জনগণের ওপরেই ছেড়ে দিচ্ছি।”
দল গোছানোর অংশ হিসেবে শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২টি আসনের নেতাকর্মীদের সাথে অনলাইনে বৈঠক করেছেন বলে জানান। তিনি আরও বলেন, “তারা হয়তো আমাকে দণ্ডিত করেছে এবং আমি হয়তো নির্বাচনে অংশ নিতে পারব না। কিন্তু আওয়ামী লীগকে কেন নিষিদ্ধ বা স্থগিত করা হবে? আমরা যদি খারাপ কিছু করে থাকি, তবে তার সিদ্ধান্ত জনগণকেই নিতে দিন।”
এ বিষয়ে ঢাকা ও দিল্লির সরকারি অবস্থান জানতে চাওয়া হলে বাংলাদেশের সরকারি মুখপাত্রদের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে গত এপ্রিল মাসে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল যে, তারা বাংলাদেশের প্রত্যর্পণের অনুরোধটি পরীক্ষা করে দেখছে এবং ঢাকার নতুন সরকারের সাথে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।
