কলকাতার নিউ মার্কেটের মির্জ়া গালিব স্ট্রিটের হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে মোট ন’জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে সাত জনের পরিচয় বুধবারই জানা গিয়েছিল। বাকি দু’জনকে শনাক্ত করা গেল বৃহস্পতিবার। তারাও বাংলাদেশের নাগরিক। তাদের দেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশ হাই কমিশনের নথির সঙ্গে হোটেলের নথি, পাসপোর্ট ইত্যাদি মিলিয়ে দেখে মৃতদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার শনাক্ত করা হয়েছে এসএম আলিমুজ্জামান (৪৫) এবং রেবতী সরকারের দেহ। তারা বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা। এই নিয়ে অগ্নিকাণ্ডে মৃতদের মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যা দাঁড়াল সাত। বাকিরা হলেন ৭৪ বছরের আক্রম আলি, ৩৯ বছরের দেবাশীষ দত্ত, ২৭ বছরের আফসানা শারমীন এবং ২ বছর ৮ মাস বয়সি শিশু স্বর্ণশীষ দত্ত। তারা একই পরিবারের সদস্য। চিকিৎসার প্রয়োজনে ভারতে এসেছিলেন। দেবাশীষ ছিলেন পেশায় সাংবাদিক। এ ছাড়া, বাবু আহমেদ (৩৭) নামের আরও এক বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। সকলেই মূলত ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে মারা গিয়েছেন। হোটেলের ঘরে বিছানার উপর, মেঝেতে এবং শৌচালয়ে দেহগুলি পড়েছিল।
আলিমুজ্জামানের এক আত্মীয় বলেন, ‘‘আমি কলকাতায় ছিলাম। উনি আমার মামা হন। বাংলাদেশ থেকে আর এক মামা আমাকে এই খবর জানান। তার পর এখানে খোঁজখবর করে জানতে পারলাম উনি ওই হোটেলেই ছিলেন। দেহ এখনও দেখতে পাইনি। মামা ব্যবসায়ী ছিলেন। চিকিৎসার জন্য এখানে এসেছিলেন। যা হয়েছে, খুবই দুঃখজনক। এমন যেন আর কখনও না হয়।’’
মির্জ়া গালিব স্ট্রিটের হোটেল ‘শিখা ইন’-এ দু’জন ভারতীয়েরও মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের তালিকায় রয়েছেন শিলিগুড়ির বাসিন্দা ৬৮ বছরের যোগ নারায়ণ অগ্রবাল এবং ঝাড়খণ্ডের গিরিডির বাসিন্দা ১৯ বছরের সন্দীপ পাসোয়ান। সন্দীপ কলকাতায় জীবনের প্রথম চাকরিটি করতে এসেছিলেন। হোটেলের রিসেপশনের দায়িত্বে ছিলেন তিনিই। শর্ট সার্কিট থেকে সেই রিসেপশনেই লাগে আগুন।
নিউ মার্কেটের ঘিঞ্জি এলাকায় পাঁচতলা বিল্ডিংয়ের তিনতলায় ছিল ‘শিখা ইন’। মঙ্গলবার রাত দেড়টা থেকে ২টোর মধ্যে সেখানে আগুন লেগে যায়। পুলিশ ও ফরেনসিক সূত্রে খবর, মাত্র ১১০০ বর্গফুট জায়গার মধ্যে পাঁচটি ঘর করা হয়েছিল। প্রত্যেক ঘরের সঙ্গে ছিল স্নানঘর। তার মধ্যেই রিসেপশন এবং যাতায়াতের ছোট পরিসর। কতটা ঘিঞ্জি জায়গার মধ্যে হোটেলগুলি মাথা তুলেছিল, এখান থেকেই স্পষ্ট। অভিযোগ, জায়গা কম থাকায় ঘরগুলিতে ‘স্লাই়ডিং ডোর’-এর ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। টানা একটিই ফল্স সিলিং ছিল সব ঘরের উপরে, যা কাঠের তৈরি। তার ফাঁক দিয়েই আগুনের ধোঁয়া ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে বলে বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক অনুমান। হোটেলের ১০ জন আবাসিকের মধ্যে মাত্র দু’জন বাঁচতে পেরেছেন। তাঁরা জানলা দিয়ে বেরিয়ে হোটেলের কার্নিসের উপর দাঁড়িয়েছিলেন দীর্ঘক্ষণ। পরে দমকল তাদের উদ্ধার করে। অভিযোগ, হোটেলের কোথাও তেমন অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না। অথচ, দমকলের সদর দফতর থেকে এই বিল্ডিংয়ের দূরত্ব মাত্র কয়েক সেকেন্ডের। কলকাতা পুরসভাও রয়েছে ৯৫০ মিটারের মধ্যে। এত অব্যবস্থা, অনিয়ম কেন কারও চোখে পড়েনি, প্রশ্ন উঠছে। ইতিমধ্যে মির্জ়া গালিব স্ট্রিটের ন’টি গেস্ট হাউস এবং চারটি রেস্তরাঁকে শোকজ় করেছে দমকল বিভাগ। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সন্তোষজনক উত্তর না-পাওয়া গেলে সেগুলি বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।



