ভূমিকম্প নয়, তুষারধসের কারণেই ভয়াবহ হড়পা বান এসেছিল নেপালের ভোটেকোশী নদীতে। বুধবার রাতেই তা স্পষ্ট করে দিয়েছিল আমেরিকার ভূতত্ত্ব পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইউনাইটেড স্টেটস জিয়োলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস)।পরে উপগ্রহচিত্রেও এই বক্তব্যের প্রমাণ মেলে। দেখা যায় হিমালয়ের অন্যতম পর্বতশৃঙ্গ ল্যাংট্যাং লিরুঙের নিকটবর্তী জায়গা থেকে নীচে নেমে এসেছে হিমবাহের একাংশ।
৫১২৭ মিটার উচ্চতায় হিমবাহটির একাংশ ভেঙে যায়। ঢালু পথে বেশ কিছুটা গড়িয়ে আসার পর কয়েকশো মিটার উচ্চতা থেকে তুষার, কাদামাটি এসে পড়ে দুই পর্বতের মধ্যবর্তী সঙ্কীর্ণ উপত্যকায়। তারপর পর্বতের ঢাল বরাবর ওই তুষার এবং কাদা-পাথরের স্রোত নীচের দিকে নামতে শুরু করে। চিন সরকারের অন্যতম ভূতত্ত্ববিদ গুয়ো জ়াওচেং জানিয়েছেন, তুষার এবং কাদা-পাথরের স্রোত প্রতি সেকেন্ডে ৫০ মিটার (১৬৫ ফুট) দূরত্ব পাড়ি দিয়েছে। এইভাবে প্রায় ২০ কিলোমিটার জায়গা কার্যত চোখের নিমেষে তুষার আর কাদা-পাথরের স্রোতে বিধ্বস্ত হয়ে যায়। এত অল্প সময়ে দুর্যোগ নেমে আসায় কিছু বুঝে উঠতেই পারেনি সাধারণ মানুষ।
উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পর্বতের ঢাল বেয়ে নীচে নেমে তুষার এবং কাদা-পাথরের স্রোত লিন্দেখোলা নদীতে গিয়ে মেশে। এই নদী নেপাল এবং চিনের সীমান্তবর্তী এলাকার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। লিন্দেখোলার খাত ধরে এগিয়ে তিব্বতের গিরং বন্দরের কাছে পৌঁছে যায় এই কাদা-পাথরের স্রোত। কাদা-পাথরের স্রোত নদীর দু’কূল ছাপিয়ে বাড়িঘর, রাস্তা, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, জনবসতি ভাঙতে ভাঙতে এগিয়ে যায়।
কাদা-পাথরের স্রোত ভোটেকোশী এবং ত্রিশূলী নদীর খাত বরাবর ১০০ কিলোমিটার নীচে, প্রায় নেপাল-ভারত সীমান্তের কাছে নেমে আসে। হিমবাহটি ভেঙেছিল ৫২০০ মিটার উচ্চতায়। কাদা-পাথরের স্রোত ৪৫০০ মিটার নীচে নেমে আসে।
ধসে পড়া হিমবাহ থেকে ২৩ কিলোমিটার দূরত্বে রয়েছে নেপালের তিমুরে শহর। এই শহরের কিছুটা আগেই ভোটেকোশী নদী এসে ত্রিশূলী নদীতে মিশেছে। এই পথ ধরেই কাদা-পাথরের স্রোত পৌঁছোয় ৫ কিলোমিটার দূরের স্যাপ্রুবেসীতে। তার পর সেখান থেকে আরও কিছুটা এগিয়ে হাকুবেসিতে। কাদা-পাথরমিশ্রিত ঘোলাপানিতে তখন ভাসছে আসবাবপত্রের ভাঙা টুকরো, গাছের শুকনো ডাল, বাড়ির ভাঙা অ্যাসবেসটস, গ্যাস সিলিন্ডার ইত্যাদি।
কাদা-পাথরের স্রোত সেখানেই থামেনি। ভীমবেগে এগিয়ে চলে হিমবাহ থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরে থাকা বেত্রীবতীতে। সেখান থেকে ত্রিশূলী বাজার। তখনও স্থানীয়েরা এই হড়পা বানের বিষয়ে কিছুই জানেন না। অথচ সেতু, জনপদ ভাঙতে ভাঙতে রাক্ষুসে গতিতে নেমে আসছে কাদা-পাথরের স্রোত। সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিয়োয় দেখা যাচ্ছে, কাদা-পাথরের স্রোত আছড়ে পড়ছে ত্রিশূলী বাজারে। দোকানবাজারে ভিড় জমানো মানুষ দ্রুতগতিতে পালানোর চেষ্টা করছেন। আর তাদের ঠিক পিছনেই খয়েরি বর্ণের কাদা-পাথরের স্রোত গোটা এলাকাকে ঢেকে দিচ্ছে।
এর পর নিম্ন অববাহিকা বরাবর আরও নেমে এসে এই স্রোত পৌঁছোয় দেবীঘাটে। তখন অবশ্য তার গতি কিছুটা কমেছে। আরও ধ্বংসাবশেষ জমা হয়েছে তাতে। তার পর হিমবাহ থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে কোলতারপুরে এসে ক্ষান্ত হয় এই কাদা-পাথরের স্রোত।
নেপালের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন জানিয়েছে, হড়পা বানের কারণে ভোটেকোশী এবং ত্রিশূলী নদীতে এসে জমেছিল বিপুল পরিমাণ তুষার গলা পানি, বড় পাথর, কাদামাটি ইত্যাদি। এর ফলে ওই দুই নদীতে দ্রুত পানির স্তর বৃদ্ধি হতে থাকে। গলচি এলাকায় মাত্র আধ ঘণ্টার মধ্যে নদীর পানির স্তর ৯ মিটার বেড়ে যায়। নদীখাত ছাপিয়ে অববাহিকা এলাকায় থাকা বাড়িঘর, দোকানবাজার— সব কিছু মুহূর্তের মধ্যে ভেসে যায়।
বুধবার রাতে আমেরিকার ভূতত্ত্ব পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, প্রাথমিকভাবে যে ভূতাত্ত্বিক কম্পনকে ভূমিকম্প বলে মনে করা হচ্ছিল, তা আদতে হিমবাহধস। হিমবাহ কাদামাটির তাল নিয়ে নদীর অববাহিকার দিকে নামতেই ওই বিপর্যয় ঘটে বলে দাবি করেছে ওই মার্কিন সংস্থা। ইউএসজিএস জানায়, বুধবার সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে (স্থানীয় সময় অনুসারে) নেপাল-তিব্বত সীমান্তে কোনও ভূমিকম্প হয়নি। যে ঘটনাকে ৪.৪ মাত্রার ভূকম্পন বলে মনে করা হয়েছিল, সেটি আদতে হিমবাহধস এবং তজ্জনিত কারণে কাদামাটির স্রোত নেমে আসা। ভূবিজ্ঞানীদের একাংশ প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের পরে জানিয়েছিলেন, তুষারধসের জেরে পাথর ও বরফের স্তূপে অবরুদ্ধ হয়েছিল নদীর গতিপথ। জমে যাওয়া পানির চাপে হঠাৎই সেই ‘অবরোধ’ ভেঙে যায়। ফলে সৃষ্টি হয় হড়পা বান।



