বাংলাদেশে মহামারি আকারে হাম ছড়িয়ে পড়ার সাড়ে পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বরং প্রতিদিনই নতুন করে আক্রান্ত ও মৃত্যুর খবর আসছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও এ রোগের উপসর্গ নিয়ে খুলনা, কুমিল্লা ও মৌলভীবাজারে অন্তত তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত সাড়ে পাঁচ মাসে হাম ও এর উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৯৪।
একই সময়ে গত ১৫ মার্চ থেকে সারা দেশে হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি শিশু। আক্রান্তদের মধ্যে গুরুতর জটিলতা তৈরি হয়ে অনেককে হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে। চলতি বছর বিভিন্ন এলাকায় শিশুদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্কদেরও হাম আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
প্রাদুর্ভাব শুরুর পর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা হলেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি। গত এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির পর কয়েক মাসের মধ্যে দেশে শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ বলয় বা ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি হওয়ার প্রত্যাশা করা হয়েছিল। কিন্তু কয়েক মাস পরও সংক্রমণ অব্যাহত থাকায় সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু টিকা দেওয়ার সংখ্যা দিয়ে কার্যকর টিকা কাভারেজ নিশ্চিত করা যায় না। বাদ পড়ে যাওয়া শিশুদের শনাক্ত করা, তাদের টিকার আওতায় আনা এবং মাঠপর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি না থাকলে সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন।
হাসপাতালগুলোতে আবার বাড়ছে রোগীর চাপ
হাম ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে ঢাকার বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে আসছেন অভিভাবকেরা। রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় একপর্যায়ে হাসপাতালের শয্যা সংখ্যাও দ্বিগুণের বেশি বাড়ানো হয়।
গত এপ্রিল মাসে টিকাদান কার্যক্রম শুরুর পর জুন ও জুলাইয়ে রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমে এসেছিল। তবে সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে আবারও রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে।
চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে, দেরিতে চিকিৎসা শুরু হওয়া শিশুদের মধ্যে জটিলতা তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে থেকে আসা অনেক শিশুর ক্ষেত্রে নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হয়ে অবস্থার অবনতি ঘটছে।
কেরানীগঞ্জের সাত মাস বয়সী একটি শিশুকেও কয়েক দিন ধরে তীব্র জ্বর ও পরে সারা শরীরে র্যাশ দেখা দেওয়ার পর হাসপাতালে নেওয়া হয়। প্রথমে ডেঙ্গু সন্দেহ করা হলেও চিকিৎসকেরা পরে হাম শনাক্ত করেন।
টিকা কার্যক্রমে শতভাগ কাভারেজের দাবি, তবু প্রশ্ন
সারা দেশে হাম ছড়িয়ে পড়ার প্রায় তিন সপ্তাহের মাথায় জরুরি ভিত্তিতে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি উপজেলায় টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা হয়। পরে ২০ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য দেশব্যাপী গণটিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়।
কর্মসূচির শুরুতে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল ও মে মাসের ওই কর্মসূচিতে প্রায় ১ কোটি ৯৬ লাখ ৬১ হাজারের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় টিকা পাওয়ার সংখ্যা শতভাগেরও বেশি।
তবে টিকার এই হিসাব নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে। তাদের মতে, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাই যদি বাস্তব জনসংখ্যার তুলনায় কম হয়, তাহলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হলেও প্রকৃত কাভারেজ শতভাগ নাও হতে পারে।
এর একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায় একই বয়সী শিশুদের জন্য পরিচালিত ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল কর্মসূচির তথ্যেও। গত জুনে পরিচালিত ওই কর্মসূচিতে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ শিশু ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল পেয়েছে। ফলে হাম টিকাদান কর্মসূচিতে প্রকৃতপক্ষে কত শতাংশ শিশু টিকার আওতায় এসেছে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জরুরি পরিস্থিতিতে পুরোনো জনসংখ্যাতাত্ত্বিক তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত টিকাদান শুরু করা প্রয়োজনীয় হলেও পরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাদ পড়া শিশুদের তথ্য সংগ্রহ করা দরকার ছিল। মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে এমন ‘মাইক্রো প্ল্যানিং’ করা হলে টিকাবঞ্চিত শিশুদের শনাক্ত করা এবং তাদের টিকার আওতায় আনা সহজ হতো।
জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন, প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের
হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শুরুতেই আরও ব্যাপক ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, মহামারি বা স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হলে টিকাদান, চিকিৎসা, নজরদারি ও জনসচেতনতা—সবগুলো ক্ষেত্রে সমন্বিতভাবে কাজ করা সম্ভব হতো।
প্রাদুর্ভাবের শুরুতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়া এবং জেলা পর্যায়ে হাম আক্রান্ত শিশুদের পর্যাপ্ত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে না পারার কারণে পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হয়েছে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, হাম মোকাবিলায় শুধু টিকা কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসা, সংক্রমিত শিশুদের নজরদারি, টিকাবঞ্চিত শিশু শনাক্তকরণ এবং অভিভাবকদের সচেতন করার কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে।



