বছরের পর বছর ধরে অস্ট্রেলীয়রা জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে আলোচনা করে আসছেন মুদি পণ্য থেকে বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ থেকে শুরু করে বন্ধকী ঋণের কিস্তি পর্যন্ত। তবে আরেকটি বিল নীরবে গৃহস্থালির জন্য সবচেয়ে বড় আর্থিক ধাক্কাগুলোর একটিতে পরিণত হচ্ছে, আর সেটি আসে বছরে মাত্র একবার চিঠির বাক্সে। এই বিলটি হলো বাড়ির বীমা।
অস্ট্রেলিয়ান প্রুডেনশিয়াল রেগুলেশন অথরিটি (APRA) ২০২৬ সালের মার্চ মাসে তার প্রথম Insurance Climate Vulnerability Assessment, Mind the Gap প্রকাশ করে; এটি ছিল একটি স্ট্রেস টেস্ট, যেখানে আগামী ২৫ বছর (২০২৬- ৫০) সময়ে অস্ট্রেলিয়ার প্রায় ১০ মিলিয়ন বাড়ির বীমা প্রিমিয়াম ও তা বহনের সক্ষমতার প্রবণতা মডেল করা হয়েছে।
এর মূল উপসংহার হলো: প্রায় ১৪ লাখ (অথবা প্রতি সাতটি পরিবারের মধ্যে একটি) অস্ট্রেলীয় পরিবার ইতোমধ্যেই তাদের বীমার খরচ বহনের ক্ষেত্রে চাপে রয়েছে এবং কার্যত কোনো কভারেজের জন্য অর্থ পরিশোধ করছে। দুটি গুরুতর কিন্তু সম্ভাব্য জলবায়ু পরিস্থিতিতে ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা প্রতি চারটি বাড়ির মধ্যে একটিতে পৌঁছাতে পারে অর্থাৎ আরও এক মিলিয়ন বাড়ির মালিকের জন্য নিজেদের বাড়ি সুরক্ষিত রাখার খরচ বহন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
এর প্রক্রিয়াটি বেশ সহজ। APRA দেখতে পেয়েছে, ২০১০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাড়ির বীমার প্রিমিয়াম গড়ে প্রতি বছর ৭.২ শতাংশ হারে বেড়েছে, যা একই সময়ে গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ৩.১ শতাংশের দ্বিগুণেরও বেশি। গড় প্রিমিয়াম ক্রমেই বাড়ছে, এবং মডেলিংয়ে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল যে শুধু অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত পাঁচ বছরে এটি ৫১ শতাংশ বেড়ে ১,৯৪০ ডলার থেকে ২,৯৩৮ ডলার -এ পৌঁছাবে। বর্তমানে ডারউইন, সিডনি ও ব্রিসবেনের একটি গড় পরিবার বছরে গড়ে প্রায় ৪,০০০ ডলার পরিশোধ করছে। বন্যা/ঘূর্ণিঝড়প্রবণ পোস্টকোডের পরিবারগুলোকে এর চেয়েও অনেক বেশি দিতে হচ্ছে । ২০২৫ সালের একটি “catastrophe” বছরের পর রাজধানী শহরগুলোর বীমা কোট ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ১২ মাসে আরও ১৪.৮ শতাংশ বেড়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি বৃদ্ধির প্রায় দ্বিগুণ।
এটি শুধু পরিবারের সমস্যা নয়। APRA-এর বিশ্লেষণ বলছে, অস্ট্রেলিয়ার ৫ শতাংশ মর্টগেজধারী ইতোমধ্যেই বীমা বহনযোগ্যতার চাপে রয়েছেন। এর সঙ্গে সম্পর্কিত মর্টগেজ ঋণের পরিমাণ ৫৭ বিলিয়ন, যা সব ধরনের হোম লোন সম্পদের প্রায় ৩ শতাংশ। ব্যাংকগুলোর বীমা প্রয়োজন, কারণ বাড়িটিই মর্টগেজের গ্যারান্টি হিসেবে কাজ করে এবং বীমা কভারেজ হারিয়ে গেলে ঝুঁকি বীমা কোম্পানি থেকে ব্যাংকের কাছে এবং শেষ পর্যন্ত ঋণগ্রহীতার কাছে স্থানান্তরিত হয়। APRA স্পষ্ট করে বলেছে, সুরক্ষা ঘাটতি এখন শুধু ভোক্তা-সংক্রান্ত সমস্যা নয়; এটি একটি “pure financial-stability issue”, অর্থাৎ সরাসরি আর্থিক স্থিতিশীলতার বিষয়।
এই সমস্যার প্রথম অভিজ্ঞতা এখন আঞ্চলিক অস্ট্রেলিয়াও লাভ করছে।
Climate Council-এর হিসাব অনুযায়ী, বন্যা, দাবানল, উপকূলীয় ক্ষয় বা চরম বাতাসের ঝুঁকির কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার প্রায় ৫ লাখ ২০ হাজার (অথবা প্রতি ২৫টি সম্পত্তির মধ্যে প্রায় একটি) সম্পত্তি বীমার আওতার বাইরে চলে যাবে এবং আরও প্রতি ১১টির মধ্যে একটি সম্পত্তি আন্ডারইনস্যুরড বা অপর্যাপ্তভাবে বীমাকৃত থাকবে।
NSW-এর Northern Rivers electorate অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নির্বাচনী এলাকাগুলোর একটি, বিশেষ করে ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যার পর। ২০২৫ সালের মে মাসে এই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটে, যখন Mid North Coast-এর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা (প্রতি ৫০০ বছরে একবার হওয়ার মতো) পাঁচজনের প্রাণ কেড়ে নেয় এবং ১৬টি স্থানীয় সরকার এলাকায় দুর্যোগ ঘোষণা করা হয়। প্রতিটি দুর্যোগের পর বীমার হিসাব নতুন করে নির্ধারণ করা হয়।
সরকারি পদক্ষেপ একটি পার্থক্য তৈরি করতে পারে। Australian Reinsurance Pool Corporation-এর তথ্য অনুযায়ী,২০২২ সালে ১০ বিলিয়ন গ্যারান্টিসহ এই পুল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বেশি ঘূর্ণিঝড়-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে গড় প্রিমিয়াম ৩৭ শতাংশ কমেছে এবং পলিসির প্রাপ্যতা ২৭ শতাংশ বেড়েছে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ACCC-এর সর্বশেষ মনিটরিং রিপোর্টে (জুন ২০২৬-এ প্রকাশিত) দেখা গেছে, সারা দেশে প্রিমিয়াম এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত আছে। এই পুল কেবল ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি কভার করে; বন্যা ও দাবানলপ্রবণ এলাকার জনগোষ্ঠীর জন্য এর সমতুল্য কোনো পুল নেই।
এতে আসল প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। বন্যা ও দাবানলপ্রবণ এলাকাগুলোর জন্য সরকারের কি pooled-risk structures বা সম্মিলিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো চালু করা উচিত? ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগে আরও বেশি বিনিয়োগ করা এবং building codes বা নির্মাণ বিধিমালা উন্নত করা উচিত? উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত এলাকায় নতুন উন্নয়ন বা বসতি স্থাপন প্রতিরোধ করা উচিত? নাকি বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া উচিত যে, কোনো কোনো জনগোষ্ঠীকে সরাসরি সহায়তা দিতে হবে যদি বীমার কভারেজের খরচ অতিরিক্ত হয়ে যায়?
এর কোনোটিই নেওয়ার জন্য সহজ সিদ্ধান্ত নয় এবং এর কোনোটিই ঝুঁকিকে অদৃশ্য করে দেবে না।
অস্ট্রেলিয়া দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং পুড়ে যাওয়া হেক্টরের হিসাবে পরিমাপ করে এসেছে। ক্রমেই এটিকে ডলারের হিসাবেও গণনা করা উচিত যে ডলারগুলো নীরবে কিন্তু অবিরামভাবে দেশের মানুষের চিঠির বাক্সে এসে পৌঁছাচ্ছে।




