রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা. মরিয়ম খাতুনের (১৯) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় করা মামলায় এমপি গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগমকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের বিরুদ্ধে মরিয়মকে নির্যাতন এবং আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয়েছে।
সোমবার ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান গ্রেপ্তারের তথ্য নিশ্চিত করেন। মামলার অপর আসামি মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমান পলাতক রয়েছেন। পুলিশ প্রথমে তিন আসামিকে গ্রেপ্তারের কথা জানালেও পরে তা সংশোধন করে দুজন গ্রেপ্তারের তথ্য নিশ্চিত করে।
রোববার সন্ধ্যা সাতটার দিকে ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ফ্ল্যাটটি সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের। পুলিশ, অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত শুরু করেন। পরে মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
পুলিশ জানায়, ফ্ল্যাটের একটি কক্ষের দরজা ভেঙে মরিয়মকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁর বিছানার ওপর থেকে একটি ‘সুইসাইড নোট’ উদ্ধারের কথাও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. ফজলুল করিম জানান, প্রাথমিকভাবে চিরকুটটি মরিয়মের লেখা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে লেখাটি তাঁরই কি না, তা সিআইডির ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।
মামলায় নির্যাতনের অভিযোগ
মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে রোববার গভীর রাতে শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলাটি করেন। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম ও মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা গ্রামের বাসিন্দা মাসুম বিল্লাহ পেশায় একজন মুদিদোকানদার। তাঁর বড় মেয়ে মরিয়মের সঙ্গে গত জুনে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী বিয়ে হয়। বিয়ের পর মরিয়ম ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে গাজী নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদার সঙ্গে বসবাস করতেন।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গাজী নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন। মরিয়ম বিভিন্ন সময়ে মুঠোফোনে তাঁর পরিবারের সদস্যদের নির্যাতনের বিষয়টি জানিয়েছিলেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিয়েতে মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানের প্রত্যক্ষ প্ররোচনা ছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, রোববার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে গাজী নজরুল ইসলাম মরিয়মের বাবাকে ফোন করে দ্রুত ন্যাম ভবনের বাসায় যেতে বলেন। পরে মাসুম বিল্লাহ তাঁর শ্যালিকা সুফিয়াকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে পৌঁছান। বাসায় গিয়ে তাঁরা ভিড় দেখতে পান এবং পরে মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহের খবর জানতে পারেন।
পুলিশের সহায়তায় কক্ষের দরজা ভেঙে মরিয়মের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে ঘটনাস্থলে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট কাজ করে এবং থানা-পুলিশ মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে।
আগের ঘটনা
গাজী নজরুল ইসলাম জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। গত জুলাইয়ে তাঁর ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তিনি জানান, ভিডিওতে থাকা তরুণী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুন।
এরপর ২২ জুলাই জামায়াতে ইসলামী গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে। দলটির পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্পিকার, নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে চিঠি দেওয়া হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার দুই আসামিকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হবে কি না, তা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। মামলার অভিযোগ ও মরিয়মের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হবে।




