রিয়াদের পর এবার সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় শহর দাম্মামের কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একজন নিহত ও আটজন আহত হয়েছেন। এরই মধ্যে সৌদি আরবে কর্মরত জরুরি দায়িত্বের বাইরে থাকা মার্কিন দূতাবাসকর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের দেশটি ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে আরও হামলার আশঙ্কায় বিদেশি নাগরিক ও আন্তর্জাতিক যাত্রীদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। একাধিক দেশের ভ্রমণ সতর্কতা এবং ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্নের কারণে সৌদি আরব সফর ও দেশটি হয়ে যাতায়াতের পরিকল্পনা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) সন্ধ্যায় দাম্মামের কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটে বলে সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। আহত আটজনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তাঁদের কারও আঘাত সামান্য, আবার কারও অবস্থা গুরুতর। বিমানবন্দরের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণেও কাজ করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে হামলায় কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে এবং কারা সরাসরি জড়িত, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার হুমকি দিয়ে আসছে। এর আগে দাম্মামের এই বিমানবন্দরেও হামলার দায় স্বীকার করেছিল গোষ্ঠীটি। তবে সর্বশেষ হামলার দায় তারা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে—এমন নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
মার্কিন কর্মীদের সৌদি আরব ছাড়ার নির্দেশ
পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর সৌদি আরবে কর্মরত জরুরি দায়িত্বের বাইরে থাকা মার্কিন সরকারি কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের দেশটি ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট বলেছেন, হুতিদের ক্রমবর্ধমান হামলায় বেসামরিক বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে প্রাণহানি এবং বিমান চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটছে।
সৌদি আরবে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদেরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস। সম্ভাব্য আরও হামলা, আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। সৌদি আরবের বিমানবন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রেও মার্কিন সরকারি কর্মীদের জন্য বিশেষ অনুমোদনের বিধিনিষেধ রয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই নির্দেশ দেশটিতে থাকা সব মার্কিন নাগরিক কিংবা সব বিদেশি নাগরিককে সৌদি আরব ছাড়ার নির্দেশ নয়। একইভাবে উপসাগরীয় অঞ্চলের সব মার্কিন দূতাবাসের কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে—এমন খবরও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর নাকচ করেছে।
রিয়াদ বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার পর নতুন উদ্বেগ
দাম্মামের ঘটনা সৌদি আরবের বিমান চলাচল খাতের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। এর আগে রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও ধারাবাহিক হামলার ঘটনা ঘটে। ১০ অক্টোবরের হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল। পরদিন বিমানবন্দরটিতে নতুন হামলায় আরও একজন নিহত ও ১১ জন আহত হওয়ার খবর আসে। এসব ঘটনার পর রিয়াদ বিমানবন্দরের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ সংস্থা ফ্লাইট পরিচালনায় পরিবর্তন আনে।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তরও সৌদি আরবের ইয়েমেন সীমান্তবর্তী এলাকায় ভ্রমণ না করার এবং দেশটির অন্য অংশে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। দেশটির সতর্কবার্তায় বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন স্থাপনায় আরও হামলার ঝুঁকি এবং ফ্লাইট বাতিলের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। ফলে সৌদি আরবে কর্মরত বিদেশি নাগরিক, ব্যবসায়ী, পর্যটক ও транজিট যাত্রীদের ভ্রমণ পরিকল্পনা নিয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে।
তেলক্ষেত্রেও হামলা, নিহত দুই বিদেশি কর্মী
বিমানবন্দরের পাশাপাশি সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোও হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। বুধবার দেশটির শাইবাহ তেলক্ষেত্রের একটি স্থাপনা লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার চেষ্টা প্রতিহত করে সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। এরপর ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে দুই বিদেশি কর্মী নিহত হন। নিহতদের একজন ফিলিপাইনের এবং অন্যজন নেপালের নাগরিক। এ ঘটনায় আরও দুজন আহত হয়েছেন বলে সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। তবে ওই হামলার জন্যও কোনো গোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়ী করা হয়নি।
হুতিদের হামলার হুমকির মধ্যে সৌদি আরবের বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিদেশি কর্মীদের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল এবং দেশটিতে যাতায়াতের ওপর এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্ন, ভ্রমণসূচি পরিবর্তন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।




