ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আজ শনিবার শুরু হচ্ছে দুই দিনব্যাপী ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। বিশ্বের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর মধ্যে এবারের সম্মেলনে মুখোমুখি হচ্ছেন বিশ্বের প্রভাবশালী কয়েকটি দেশের নেতারা। সম্মেলনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের উপস্থিতি এবারের আয়োজনকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে অনুষ্ঠিতব্য সম্মেলনে আয়োজক ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে পুতিন, জিনপিং, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানসহ ব্রিকসের অন্যান্য সদস্য দেশের নেতারা অংশ নিচ্ছেন। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও সম্মেলনকে ঘিরে দিল্লিতে রয়েছেন। সম্প্রসারিত ব্রিকস এখন ১১টি সদস্যদেশের জোট। এই দেশগুলো সম্মিলিতভাবে প্রায় ৩৭০ কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে এবং বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ তাদের হাতে।
চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং শনিবার সকালে নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন। ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি বিকেলে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে দুই নেতার বৈঠক হওয়ার কথা। আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও সীমান্তসংক্রান্ত বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে।
জিনপিংয়ের এবারের ভারত সফরের আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। ২০১৯ সালের পর এই প্রথম তিনি ভারত সফর করছেন। ২০২০ সালে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চীনের সেনাদের প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি হয়েছিল। এরপর সীমান্ত বিরোধসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন অব্যাহত ছিল। ফলে জিনপিংয়ের দিল্লি সফরকে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও শুক্রবার নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন। ব্রিকস সম্মেলনের বাইরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে। দুই নেতা প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, প্রযুক্তি, ওষুধশিল্প এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করেছেন। পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়া ও কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাত, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তার বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধও এবারের ব্রিকস সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হয়ে উঠেছে। পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে মোদি আবারও যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা ও কূটনীতির পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘাত নিরসনে সংলাপ ও কূটনীতিই সঠিক পথ বলে মত দিয়েছেন মোদি। কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাতের প্রভাব জাহাজ চলাচল ও ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তার ওপরও পড়ছে।

পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতও আলোচনায়
অন্যদিকে, ব্রিকস সম্মেলনের আগে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন মোদি। আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ নিরাপদ রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা ও জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার মধ্যেই ইরানের প্রেসিডেন্টের দিল্লি সফর হওয়ায় বিষয়টি সম্মেলনের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
পেজেশকিয়ান এর আগে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও চাপকে ‘গুরুতর ও বিপজ্জনক’ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, বর্তমান বিশ্ব নজিরবিহীন জটিলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ব্রিকস সদস্য ও অংশীদার দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমন্বয় কতটা কার্যকর হয়, সেটিও এবারের সম্মেলনে নজর কাড়ছে।
ব্রিকসের অর্থনৈতিক সহযোগিতায় জোর
এবারের সম্মেলনে অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও গভীর করার বিষয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ভারতের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল ব্রিকস দেশগুলোর পেমেন্ট ব্যবস্থা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করার, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানোর এবং ডিজিটাল বাণিজ্যকে আরও সহজ করার প্রস্তাব দিয়েছেন।
তিনি ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা ইউপিআইকে ব্রিকস দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃসীমান্ত আর্থিক সহযোগিতার সম্ভাব্য ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন। স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য এবং পারস্পরিক পেমেন্ট ব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে ব্রিকসের প্রভাব বাড়ানোর অন্যতম প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ব্রিকসের সম্প্রসারণের পর জোটটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব যেমন বেড়েছে, তেমনি অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যও আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা, চীনের প্রভাব, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের মতো বিষয়ে সদস্যদেশগুলোর অবস্থান সব সময় এক নয়। ফলে সম্মেলনে ঐকমত্য তৈরি করা ভারতের জন্য বড় একটি কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
‘গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠ’ কতটা ঐক্যবদ্ধ
ব্রিকস শুরু হয়েছিল ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন—এই চার দেশ নিয়ে। পরে জোটটি সম্প্রসারিত হয়ে ১১ সদস্যে পরিণত হয়েছে। নতুন সদস্যদের মধ্যে ইরানের পাশাপাশি মিসর ও ইথিওপিয়াও রয়েছে। সম্প্রসারণের ফলে জোটটি বৈশ্বিক দক্ষিণের বড় অংশের প্রতিনিধিত্ব করছে বলে মনে করা হলেও সদস্যদের ভূরাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্যও বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিকস এখন আর শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম নয়; বৈশ্বিক রাজনীতিতে পশ্চিমা শক্তির বাইরে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর প্রভাব বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে পরিণত হয়েছে। তবে সদস্যদেশগুলোর স্বার্থ ও কৌশলগত অবস্থানের পার্থক্যের কারণে বড় আন্তর্জাতিক ইস্যুতে অভিন্ন অবস্থান তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ভারতের জন্য এবারের সম্মেলন তাই একদিকে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের সুযোগ, অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখার পরীক্ষা। নয়াদিল্লি ব্রিকসকে পশ্চিমবিরোধী কোনো জোটে পরিণত না করে অর্থনৈতিক ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ধরে রাখতে চায়।
দুই দিনের এই সম্মেলনে ফলে শুধু ব্রিকসের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশই নয়, ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় উদীয়মান দেশগুলোর ভূমিকা—সবকিছুই গুরুত্ব পেতে পারে। বিশেষ করে মোদি-জিনপিং ও মোদি-পুতিন বৈঠকের ফলাফল এবং বড় আন্তর্জাতিক সংকটগুলোতে ব্রিকস নেতারা কতটা অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছাতে পারেন, সেদিকেই এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজর।




