প্রথম দফার ভোটে পিছিয়ে থেকেও দ্বিতীয় দফায় নাটকীয় প্রত্যাবর্তন ঘটিয়ে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিস্ময়কর জয় পেয়েছেন বামপন্থি নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। ডানপন্থি প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করে চতুর্থবারের মতো দেশটির প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন ৮০ বছর বয়সী এই নেতা। তাঁর বিজয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা।
নির্বাচনের ফল অনুযায়ী, লুলা পেয়েছেন ৫১ দশমিক ৭৯ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে ফ্লাভিও বলসোনারোর পক্ষে পড়েছে ৪৮ দশমিক ২১ শতাংশ ভোট। দুই প্রার্থীর ব্যবধান প্রায় ৪৪ লাখ ভোট। গত ৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত প্রথম দফার নির্বাচনে ফ্লাভিও ৪৭ শতাংশ ভোট পেয়ে এগিয়ে ছিলেন। সে সময় লুলার ভোট ছিল ৪৫ শতাংশ। কিন্তু চূড়ান্ত লড়াইয়ে ব্যবধান ঘুচিয়ে জয় ছিনিয়ে নেন লুলা।
ব্রাজিলের ১৯৮৮ সালে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পর এই প্রথম প্রথম দফায় পিছিয়ে থাকা কোনো প্রার্থী দ্বিতীয় দফায় জিতে প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন। লুলার এই প্রত্যাবর্তন দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিজয়ের পর সমর্থকদের উদ্দেশে লুলা বলেন, তাঁরা গণতন্ত্র রক্ষার লড়াইয়ে জয়ী হয়েছেন। ব্রাজিল কোনো দেশের ‘পেছনের উঠান’ হয়ে থাকবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সরকার পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং ডিজিটাল যোগাযোগের মাধ্যমে নাগরিকদের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান লুলা।
অন্যদিকে পরাজয় মেনে নিতে নারাজ ফ্লাভিও বলসোনারো ফলকে ‘ব্যাখ্যাতীত’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং নির্বাচন বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। ভোটগ্রহণের সময় দুই ঘণ্টা বাড়ানোর বিষয়টি নিয়েও তিনি আপত্তি তুলেছেন। তবে নির্বাচনী বিশেষজ্ঞদের মতে, ফল বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
লুলার বিজয় সত্ত্বেও ব্রাজিলের রাজনৈতিক বিভাজন সহজে কাটবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। নির্বাচনে ৪৮ শতাংশের বেশি ভোটার ফ্লাভিওকে সমর্থন করেছেন। পাশাপাশি দেশটির কংগ্রেসে ডানপন্থিদের শক্তিশালী অবস্থান থাকায় নতুন সরকারের নীতি বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে।
ফ্লাভিওর বাবা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারো ২০২২ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর অভ্যুত্থানচেষ্টাসংশ্লিষ্ট মামলায় ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। সেই রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে সামনে রেখেই নির্বাচনে লড়েছিলেন তাঁর ছেলে।
পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নেও লুলার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। স্যাটেলাইট তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত এক বছরে আমাজন অঞ্চলে বন উজাড়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩৩৫ বর্গকিলোমিটার, যা আগের বছরের তুলনায় ৪২ শতাংশ কম। তবে আমাজন নদীর মোহনার কাছে সমুদ্রের তলদেশে তেল অনুসন্ধানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় পরিবেশবাদীদের সমালোচনার মুখেও পড়েছেন লুলা।
লুলার জয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসাসহ বিভিন্ন বিশ্বনেতা। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া তখনও জানা যায়নি। নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছিল ফ্লাভিও বলসোনারোর প্রতি।
বিজয়ের মধ্য দিয়ে লুলা আবারও ব্রাজিলের নেতৃত্বে ফিরছেন। তবে গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণ, শক্তিশালী বিরোধী শিবির এবং অর্থনীতি ও পরিবেশনীতি ঘিরে বিতর্কের মধ্যে তাঁর নতুন মেয়াদ শুরু হতে যাচ্ছে।




